শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

শিক্ষক_ছাত্রী

শিক্ষক:তুমি কি কোন লোহার
দোকানে গিয়েছো? ছাত্রী:জি,
গিয়েছি।।
শিক্ষক:তা কিভাবে রাখা হয়?
ছাত্রী :খোলা মেলা।
শিক্ষক:তুমি কি রুপার দোকানে
গিয়েছো?
ছাত্রী :হ্যাঁ গিয়েছি।
শিক্ষক:তা কিভাবে রাখা হয়?
ছাত্রী :সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
শিক্ষক:তুমি কি স্বর্ণের দোকানে
গিয়েছো?
ছাত্রী :জি হ্যাঁ গিয়েছি।
শিক্ষক:তা কিভাবে রাখা হয়?
ছাত্রী :তা রুপার চেয়েও বেশী
সংরক্ষণ করে রাখা হয়।
শিক্ষক:তুমি কি হীরার দোকানে
গিয়েছো?
ছাত্রী :হ্যাঁ গিয়েছি।
শিক্ষক:তা কেমনে রাখা হয়?
ছাত্রী :তা স্বর্ণের চেয়েও বেশী
গুরুত্ব সহকারে ঢেকে রাখা হয়।
শিক্ষক:কেন জান?
ছাত্রী :কেননা তার দাম অত্যন্ত বেশী
তাই।যেন তাতে ময়লা না লাগে।
শিক্ষক মুচকি হেঁসে বললেন: ইসলামে
মহিলাদের মান ও সম্মান হীরার
চেয়েও অনেক অনেক বেশী। তাই তুমি
পর্দায় থাকবে।
ছাত্রী :সর্ট ড্রেসে সমস্যা কি স্যার?!
শিক্ষক:যারা তোমাকে সর্ট ড্রেস
পরতে বলছে, তারা তোমাকে লোহার
মত ব্যবহার করতে চাচ্ছে।তারা
তোমার শরীরে দাগ দেবে, ময়লা
লাগাবে, মরিচা ফেলবে। তারপর ছুড়ে
ফেলে দেবে ডাস্টবিনে।ওরা
কোনদিন তোমাকে সৌন্দর্যময় হীরা
ভাববে না, বরং ভাববে ব্যবহারেরর
লোহা। যা সাময়িক ব্যবহারের পর
ফেলে দেবে। তাই একটু বিবেক বুদ্ধি
দিয়ে ভেবে দেখ, তোমার মান সম্মান
ও ভবিষ্যৎ এর কথা । মনে রাখবে এই
দুনিয়াই কিন্তু শেষ নয়, আখিরাত বলেও
কিছু একটা আছে।

বৃহস্পতিবার, ৯ মার্চ, ২০১৭

মানব জাতির সাফল্য লাভের উপায়



৬. আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকটে বরকত চাওয়া :
বরকতের মালিক কেবল আল্লাহ তা‘আলা। তাই আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মানুষের নিকট বরকত চাওয়া যাবে না। আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকটে বরকত প্রার্থনা শিরক। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, أَفَرَأَيْتُمُ اللاَّتَ وَالْعُزَّى، وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও উযযা সম্বন্ধে এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্বন্ধে? (নাজম ১৯-২০)
আল্লামা ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালি (রহঃ) বলেন, মূর্তিপূজার অন্যতম হচ্ছে যে, মুরিদরা মূর্তির নিকট বরকত চায়, তাকে অধিক সম্মান করে, তার নিকট সাহায্য চায়, তার উপর আশা-ভরসা করে, তার কাছে শাফা‘আত চায় ইত্যাদি। এসব কাজ শিরক। যেমনটি কবরপূজারীরা নেক্কার ব্যক্তির কবরের নিকট করে থাকে। অনুরূপভাবে লাত, মানাত, উযযা এবং গাছপালা-পাথর ইত্যাদিকে মুশরিকরা পূজা করত। কোন ব্যক্তির মাযারে গিয়ে বরকত চাওয়া, সম্মান করা, শাফা‘আত ও সাহায্য চাওয়া, সবই শিরক।[1]
আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) এ ধরনের বরকত নিতে নিষেধ করেছেন। আবু ওয়াক্বীদ আল-লায়ছী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে হুনাইনের (যুদ্ধের) উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’লাম। আমরা তখন সবেমাত্র ইসলাম গ্রহণ করেছি। এক স্থানে মূর্তিপূজকদের একটি কুল গাছ ছিল; যার চার পার্শ্বে তারা বসত এবং তাদের সমরাস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। গাছটিকে তারা ‘যাতু আনয়াত’ বলত। আমরা একদিন একটি কুল গাছের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! মুশরিকদের যেমন ‘যাতে আনয়াত’ আছে, আমাদের জন্যও অনুরূপ যাতে আনয়াত (একটি গাছ নির্ধারণ) করুন। তখন নবী করীম (ছাঃ) বললেন, আল্লাহু আকবার তোমাদের এ দাবীতো পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতি ছাড়া কিছুই নয়। যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর কসম করে বলছি, তোমরা এমন কথা বলছ, যা বাণী ইসরাঈল মূসা (আঃ)-কে বলেছিল। তারা বলেছিল, হে মূসা! তাদের যেরূপ মা‘বূদ রয়েছে, আমাদের জন্যও ঐরূপ মা‘বূদ বানিয়ে দিন। তখন মূসা বললেন, তোমরা একটি গন্ডমূর্খ জাতি (আ‘রাফ ১৩৮)। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি-নীতিই অনুসরণ করছ।[2]
কুরআন ও হাদীছ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, কুল গাছে অস্ত্র-শস্ত্র ঝুলিয়ে বরকত নেওয়া শিরক। ইমাম ত্বারতুশি বলেন, লক্ষ্য কর, আল্লাহ তোমাদের উপর রহম করুন। তোমরা যেখানে কুল গাছ (অথবা যেকোন গাছ) যার দ্বারা মানুষের উদ্দেশ্য থাকে গাছটিকে সম্মান করা এবং তার থেকে কোন রোগের আরোগ্য কামনা করা এবং বরকতের উদ্দেশ্যে অস্ত্র-শস্ত্র ঝুলিয়ে রাখা, এরূপ গাছ যেখানেই পাবে, সেটাই যাতে আনয়াত। বিধায় তাকে কেটে ফেল।[3]
ইবনে ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) যে গাছের নীচে বসে ছাহাবীদের বায়‘আত নিয়েছিলেন, সে গাছটিকে তিনি কাটতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেননা মানুষেরা গাছটির ছায়াতলে আশ্রয় নিত (বরকত নেওয়ার জন্য)। ইবনে ওমর ফিৎনার ভয় করে গাছটি কেটে ফেলেন।[4]
যেসব বিষয়ে মানুষকে ফিৎনা-ফাসাদে ফেলে সেগুলোকে সমূলে উৎখাত করা শরী‘আত সম্মত হবে, যদিও সেটা কোন মানুষ হয় কিংবা কোন জীব-জন্তু অথবা কোন জড় পদার্থ হয়।[5]
ইবনে তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, গাছ-পাথর, অথবা প্রতিমা-মূর্তি, ভাষ্কর্য ইত্যাদির পার্শ্বে (বরকতের উদ্দেশ্যে) অবস্থান করা অথবা নবী করীম (ছাঃ) বা অন্যদের কবরে, অথবা নবী যেখানে বসতেন সেখানে বা কোন পীর-আওলিয়ার স্থানে বসা, অবস্থান করা কোন মুসলমানদের দ্বীন নয়, বরং সেটা মুশরিকদের দ্বীনের ন্যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তো এর পূর্বে ইবরাহীমকে সৎ পথের জ্ঞান দিয়েছিলাম এবং আমি তাঁর সম্বন্ধে ছিলাম সম্যক অবগত। যখন তিনি তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন; এই প্রতিমাগুলি কী? যেগুলোর পূজায় তোমরা রত আছ? তারা বলল, আমরা আমাদের পিতৃ পুরুষদেরকে এদের পূজাকারী হিসাবে পেয়েছি। তিনি বললেন, তোমরা নিজেরা এবং তোমাদের পিতৃ-পুরুষরাও রয়েছে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে। তারা বলল, তুমি কি আমাদের নিকট সত্য বাণী নিয়ে এসেছ, না তুমি খেল-তামাশা করছ? তিনি বললেন, না, তোমাদের প্রতিপালক তো আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন এবং এই বিষয়ে আমি অন্যতম সাক্ষী। শপথ আল্লাহর! তোমরা চলে গেলে আমি তোমাদের প্রতিমাগুলি সম্বন্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা অবলম্বন করব। অতঃপর তিনি সেগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন তাদের বড় (প্রধান) প্রতিমাটি ব্যতীত, যাতে তারা তার দিকে ফিরে আসে’ (আম্বিয়া ৫১-৫৮)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ‘তাদের নিকট ইবরাহীমের বৃত্তান্ত বর্ণনা কর। তিনি যখন তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা কিসের ইবাদত কর? তারা বলল, আমরা প্রতিমার পূজা করি এবং আমরা নিষ্ঠার সাথে তাদের সম্মানে রত থাকি। তিনি বললেন, তোমরা প্রার্থনা করলে তারা কি শোনে? অথবা তারা কি তোমাদের উপকার কিংবা অপকার করতে পারে? তারা বলল, বরং আমরা আমাদের পিতৃ-পুরুষদেরকে এরূপই করতে দেখেছি। তিনি বললেন, তোমরা কি সেগুলো সম্বন্ধে ভেবে দেখেছ, যেগুলোর পূজা করছ? তোমরা এবং তোমাদের পূর্ব পুরুষরা, তারা সবাই আমার শত্রু, জগত সমূহের প্রতিপালক ব্যতীত। তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে পথ প্রদর্শ করেন। তিনিই আমাকে দান করেন আহার্য ও পানীয় এবং রোগাক্রান্ত হ’লে তিনিই আমাকে রোগ মুক্ত করেন। আর তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন। অতঃপর আমাকে পুনর্জীবিত করবেন। আশা করি তিনি ক্বিয়ামত দিবসে আমার অপরাধ সমূহ মার্জনা করে দিবেন’ (শু‘আরা ৬৯-৮২)
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আমি বাণী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দিলাম, অতঃপর তারা প্রতিমা পূজায় রত এক জাতির সংস্পর্শে আসল, তখন তারা বলল, হে মূসা! তাদের যেরূপ মা‘বূদ রয়েছে, আমাদের জন্যও ঐরূপ মা‘বূদ বানিয়ে দিন। তখন মূসা বললেন, তোমরা একটি গন্ডমূর্খ জাতি। এসব লোক যে কাজে লিপ্ত রয়েছে, তা তো ধ্বংস করা হবে, আর তারা যা করছে তা অমুলক ও বাতিল বিষয়। তিনি আরো বললেন, আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে তোমাদের জন্য অন্য কোন মা‘বূদের সন্ধান করব? অথচ তিনিই হ’লেন একমাত্র আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে বিশ্বজগতে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন’ (আ‘রাফ ১৩৮-১৪০)
সুতরাং এটাই হচ্ছে মুশরিকদের অবস্থান। আর মুমিনগণ আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান ও ইবাদত করেন, যিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। পক্ষান্তরে মুশরিকরা প্রতিমার পার্শ্বে, কবরের পার্শ্বে, মাযারের পার্শ্বে অবস্থান করে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের ইবাদত করে এবং তাদেরই নিকট আশা-ভরসা করে, তাদেরকেই ভয় করে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের কাছেই শাফা‘আত চায়।[6]
৭. আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকটে শাফা‘আত প্রার্থনা করা :
শাফা‘আত আল্লাহর নিকট চাইতে হবে, কোন মাযার বা কোন পীর, ওলী-আওলিয়ার নিকটে নয়। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,أَمِ اتَّخَذُوْا مِنْ دُوْنِ اللهِ شُفَعَاءَ قُلْ أَوَلَوْ كَانُوْا لاَ يَمْلِكُوْنَ شَيْئًا وَلاَ يَعْقِلُوْنَ، قُلْ لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيْعًا لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُوْنَ ‘তারা কি আল্লাহ ছাড়া অপরকে শাফা‘আতকারী গ্রহণ করেছে? বল, যদিও তারা কোন ক্ষমতা রাখে না এবং তারা বুঝে না? হে নবী! বলুন, যাবতীয় শাফা‘আত আল্লাহরই ইখতিয়ারে, আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। অতঃপর তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (যুমার ৪৩-৪৪)।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, وَيَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ مَا لاَ يَضُرُّهُمْ وَلاَ يَنْفَعُهُمْ وَيَقُوْلُوْنَ هَؤُلاَءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللهِ قُلْ أَتُنَبِّئُوْنَ اللهَ بِمَا لاَ يَعْلَمُ فِي السَّمَاوَاتِ وَلاَ فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُوْنَ ‘আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন বস্ত্ত সমূহেরও ইবাদত করে যারা তাদের কোন অপকারও করতে পারে না এবং তাদের কোন উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, এরা হচ্ছে আল্লাহর নিকট আমাদের সুফারিশকারী। আপনি বলুন! তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি অবগত নন, না আকাশ সমূহে, এবং না যমীনে? তিনি পবিত্র ও তাদের মুশরিকী কার্যকলাপ হ’তে অনেক ঊর্ধ্বে’ (ইউনুস ১৮)
আলোচ্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের নিকট শাফা‘আত চাইবে, সে মুশরিক।[7]
আল্লামা ইসমাঈল দেহলভী বলেন, আয়াতটি দ্বারা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, অবশ্যই যে কোন ব্যক্তি কোন সৃষ্টি জীবের ইবাদত করে এ বিশ্বাসে যে, সে তার জন্য আল্লাহর নিকট শাফা‘আত করবে, সে শিরক করল এবং মুশরিক হয়ে গেল। কেননা আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করে, তারা বলে আমরা তো এদের পূজা এজন্যই করি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দিবে। তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে আল্লাহ তাঁর ফায়ছালা করে দিবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করবেন না’।[8]
আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্যই, তাঁর সাথে অন্যকে অংশীদার স্থাপন করার জন্য নয়। সুতরাং কোন ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের পূজা করলে, যে তার কোন উপকার ও অপকার কোনটাই করতে পারবে না, যদিও তিনি ফেরেশতা অথবা নবী হন। এ ধরনের ইবাদত শিরক হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে নবী! বলুন, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে মা‘বূদ মনে কর তাদেরকে আহবান কর; দেখবে তোমাদের দুঃখ-দৈন্য দূর করার অথবা পরিবর্তন করবার শক্তি তাদের নেই। তারা যাদেরকে আহবান করে তারাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে তাদের মধ্যে কে কত নিকটতর হ’তে পারে, তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। তোমার প্রতিপালকের শাস্তি ভয়াবহ’ (বানী ইসরাঈল ৫৬-৫৭)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ‘হে নবী বলুন! তোমরা আহবান কর তাদেরকে যাদেরকে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে (মা‘বূদ) মনে করতে, তারা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছুর মালিক নয় এবং এতদুভয়ে তাদের কোন অংশও নেই এবং তাদের কেউ তার সহায়কও নয়। যাকে অনুমতি দেয়া হয়, তার ছাড়া আল্লাহর নিকট কারো সুফারিশ ফলপ্রসূ হবে না। পরে যখন তাদের অন্তর হ’তে ভয় বিদূরিত হবে তখন তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তোমাদের প্রতিপালক কি বললেন? তদুত্তরে তারা বলবে, যা সত্য তিনি তাই বলেছেন। তিনি সর্বোচ্চ মহান’ (সাবা ২২-২৩)
আলোচ্য আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, ক্বিয়ামতের দিন কারো কোন সুফারিশ কাজে আসবে না। তবে আল্লাহ তা‘আলা যাকে অনুমতি দিবেন এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন তাকে ব্যতীত। তাই মহান আল্লাহ বলেন, وَكَم مِّن مَّلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لاَ تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئاً إِلاَّ مِن بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَى ‘আকাশ সমূহে কত ফেরেশতা রয়েছে, তাদের কোন সুফারিশ কাজে আসবে না যতক্ষণ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন’ (নাজম ২৬)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, পীর বা অলী-আওলিয়াগণ ক্বিয়ামতের দিন তাদের মুরীদগণকে সুফারিশ করে জান্নাতে পাঠাবে, এ ধারণা ভুল ও বাতিল। ক্বিয়ামতের দিন সবাই ভয়ে ভীত হয়ে থাকবে, এমনকি নবী-রাসূলগণও। এ মর্মে হাদীছে এসেছে, মা‘বাদ ইবনু হিলাল আল-আনাযী হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বছরাবাসী কিছু লোক একত্রিত হয়ে আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-এর কাছে গেলাম। আমাদের সঙ্গে ছাবিত (রাঃ)-কে নিলাম, যাতে তিনি আমাদের কাছে আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত শাফা‘আত সম্পর্কে হাদীছ জিজ্ঞেস করেন। আমরা তাঁকে তাঁর মহলেই চাশতের ছালাতরত পেলাম। তাঁর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি আমাদেরকে অনুমতি দিলেন। তখন তিনি তাঁর বিছানায় উপবিষ্ট অবস্থায় ছিলেন। অতঃপর আমরা ছাবিত (রাঃ)-কে অনুরোধ করলাম, তিনি যেন শাফা‘আতের হাদীছটি জিজ্ঞেস করার পূর্বে অন্য কিছু জিজ্ঞেস না করেন। তখন ছাবিত (রাঃ) বললেন, হে আবূ হামযাহ! এরা বছরাবাসী আপনার ভাই, তারা শাফা‘আতের হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এসেছে। অতঃপর আনাস (রাঃ) বললেন, আমাদের নিকট মুহাম্মাদ (ছাঃ) হাদীছ বর্ণনা করেছেন যে, ‘ক্বিয়ামতের দিন মানুষ সমুদ্রের ঢেউয়ের মত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। তাই তারা আদম (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুফারিশ করুন। তিনি বলবেন, এ কাজের আমি যোগ্য নই। বরং তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাও। কারণ তিনি হ’লেন আল্লাহর খলীফা। তখন তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাবে। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের জন্য নই। তবে তোমরা মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও। কারণ তিনি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন। তখন তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন, আমি তো এ কাজের জন্য নই। তোমরা ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাও। কারণ তিনি আল্লাহর রূহ ও বাণী। তারা তখন ঈসা (আঃ)-এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন, আমি তো এ কাজের জন্য নই। তোমরা বরং মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর কাছে যাও। এরপর তারা আমার কাছে আসবে। আমি বলব, আমিই এ কাজের জন্য। আমি তখন আমার রবের নিকট অনুমতি চাইব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমাকে প্রশংসাসূচক বাক্য ইলহাম করা হবে, যা দিয়ে আমি আল্লাহর প্রশংসা করব। যেগুলো এখন আমার জানা নেই।
আমি সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাব। তখন আমাকে বলা হবে, ইয়া মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। সুফারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলব,  হে আমার প্রতিপালক! আমার উম্মত! আমার উম্মত! বলা হবে যাও, যাদের হৃদয়ে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে দাও। আমি গিয়ে এমনই করব। তারপর আমি ফিরে আসব এবং পুনরায় সেসব প্রশংসা বাক্য দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। সুফারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত! আমার উম্মত! তখন বলা হবে, যাও, যাদের অন্তরে এক অণু কিংবা সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের কর। আমি গিয়ে তাই করব। আমি আবার ফিরে আসব এবং সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব। আর সিজদায় পড়ে যাব। আমাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও বল, তোমার কথা শোনা হবে। চাও দেয়া হবে। সুফারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। আমি তখন বলব। হে আমার রব! আমার উম্মত। আমার উম্মত। এরপর আল্লাহ বলবেন, যাও যাদের অন্তরে সরিষার দানার চেয়েও অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আমি যাব এবং তাই করব।
আমরা যখন আনাস (রাঃ)-এর নিকট থেকে বের হয়ে আসছিলাম, তখন আমি আমার সঙ্গীদের কোন একজনকে বললাম, আমরা যদি আবু খলীফার বাড়িতে নিজেকে গোপনে রাখা হাসান বছরীর কাছে গিয়ে আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) বর্ণিত হাদীছটি তাঁর কাছে বর্ণনা করতাম। এরপর আমরা হাসান বছরীর কাছে এসে তাঁর কাছে অনুমতির সালাম দিলাম। তিনি আমাদের প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমরা তাঁকে বললাম, হে আবু সাঈদ! আমরা আপনার ভাই আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-এর নিকট হ’তে আপনার কাছে আসলাম। শাফা‘আত বিষয়ে তিনি যেমন বর্ণনা দিয়েছেন, তেমন বর্ণনা করতে আমরা আর কাউকে শুনিনি। তিনি বললেন, আমার কাছে সেটি বর্ণনা কর। আমরা তাঁকে হাদীছটি বর্ণনা করে শোনালাম। তিনি বললেন, আরো বর্ণনা কর। আমরা বললাম, তিনি তো এর অধিক আমাদের কাছে বর্ণনা করেননি। তিনি বললেন, জানি না, তিনি কি ভুলেই গেলেন, না তোমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বলে বাকীটুকু বর্ণনা করতে অপসন্দ করলেন? বিশ বছর আগে যখন তিনি শক্তি-সামর্থ্যে ও স্মরণ শক্তিতে দৃঢ় ছিলেন, তখন আমার কাছেও হাদীছটি বর্ণনা করেছিলেন। আমরা বললাম, হে আবু সাঈদ! আমাদের কাছে হাদীছটি বর্ণনা করুন। তিনি হাসলেন এবং বললেন, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে খুব বেশী ধ্রুততাপ্রিয় করে। আমিতো বর্ণনার উদ্দেশ্যেই তোমাদের কাছে বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তিনি তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করেছেন, আমার কাছেও তা বর্ণনা করেছেন, তবে পরে এটুকুও বলেছিলেন, আমি চতুর্থবার ফিরে আসব এবং সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। শাফা‘আত কর, গ্রহণ করা হবে। আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে তাদের সম্পর্কে শাফা‘আত করার অনুমতি দান কর, যারা ‘লা-ইলা-হা ইল্লাহ’ বলেছে। তখন আল্লাহ বলবেন, আমার ইয্যত, আমার পরাক্রম, আমার বড়ত্ব ও আমার মহত্বের শপথ! যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছে, আমি অবশ্য অবশ্যই তাদের সবাইকে জাহান্নাম থেকে বের করব’।[9]
আলোচ্য হাদীছ থেকে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, কোন পীর, অলী-আওলিয়া বা কোন সৎ মানুষের শাফা‘আত করার কোন অধিকারই থাকবে না। শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলা যাকে অনুমতি দিবেন এবং যার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন সে ব্যতীত। উপরোক্ত হাদীছ দ্বারা আরো জানা যায় যে, সকল নবী-রাসূলই নিজ নিজ ওযর পেশ করবেন এবং বলবেন আমি এ কাজের যোগ্য নই। সবশেষে রাসূল (ছাঃ) আল্লাহর প্রশংসা করবেন এবং সিজদায় পড়ে কাঁদবেন তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে শাফা‘আতের অনুমতি দিবেন। সেদিন নবী করীম (ছাঃ) শিরককারীদের জন্য শাফা‘আত করবেন না। শুধুমাত্র তাওহীদপন্থীদের জন্য শাফা‘আত করবেন। আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! ক্বিয়ামতের দিন আপনার শাফা‘আত দ্বারা সমস্ত মানুষ থেকে অধিক ভাগ্যবান হবে কোন ব্যক্তি? তখন তিনি বলবেন, হে আবু হুরায়রাহ! আমি ধারণা করেছিলাম যে, তোমার আগে কেউ এ ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করবে না। কারণ হাদীছের প্রতি তোমার চেয়ে বেশী আগ্রহী আমি আর কাউকে দেখিনি। ক্বিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত দ্বারা সবচেয়ে ভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি হবে যে বিশুদ্ধ অন্তরে বলে ‘আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য মা‘বূদ নেই’।[10]
মানুষ গুনাহ করলেই কাফের হয়ে যায় না এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামীও হয় না। বরং জাহান্নামী হওয়া, না হওয়া আল্লাহর হাতে। যেমন হাদীছে এসেছে, উবাদাহ ইবনু ছামিত (রাঃ) যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও লায়লাতুল আকাবার একজন নকীব ছিলেন তিনি বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর পাশে একজন ছাহাবীর উপস্থিতিতে তিনি বলেন, তোমরা আমার নিকট এই মর্মে বায়‘আত গ্রহণ কর যে, আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, কারো প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করবে না এবং সৎ কাজে নাফরমানী করবে না। তোমাদের মধ্যে যে তা পূর্ণ করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। আর কেউ এর কোন একটিতে লিপ্ত হ’লে এবং  দুনিয়াতে তার শাস্তি পেয়ে গেলে, তা হবে তার জন্য কাফফারা। আর কেউ এর কোন একটিতে লিপ্ত হয়ে পড়লে এবং আল্লাহ তা অপ্রকাশিত রাখলে, তবে তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি যদি চান, তাকে মার্জনা করবেন আর যদি চান, তাকে শাস্তি প্রদান করবেন। আমরা এর উপর বায়‘আত গ্রহণ করলাম।[11]
আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘জান্নাতবাসীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের বলবেন, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান আছে, তাকে জাহান্নাম হ’তে বের করে আন। তারপর তাদের জাহান্নাম হ’তে এমন অবস্থায় বের করা হবে যে, তারা পুড়ে কালো হয়ে গেছে। অতঃপর তাদের বৃষ্টিতে বা হায়াতের (বর্ণনাকারী মালিক  (রহঃ) শব্দ দু’টোর কোনটি এ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন) নদীতে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে তারা সতেজ হয়ে উঠবে, যেমন নদীর তীরে ঘাসের বীজ গজিয়ে ওঠে। তুমি কি দেখতে পাও না সেগুলো কেমন হলুদ বর্ণের হয় ও ঘন হয়ে গজায়?[12] ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) সূত্রে নবী করীম (ছাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর শাফা‘আতে একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদেরকে জাহান্নামী বলেই সম্বোধন করা হবে।[13]


বরকত দান ও শাফা‘আতের মালিক কেবল মহান আল্লাহ। এগুলো করার কোন ক্ষমতা কোন মানুষের নেই। সেজন্য কোন মানুষ বা পীর, অলী, গাউছ-কুতুবকে শাফা‘আতকারী মানা যাবে না, তাদের নিকটে বরকতও প্রার্থনা করা যাবে না। যেখানে নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ব্যতীত অন্য কোন নবী-রাসূল শাফা‘আত করার সামর্থ্য রাখেন না, সেখানে সাধারণ মানুষ কি করে সুফারিশ করতে পারে। সুতরাং এ ব্যাপারে সকলকে সাবধান হ’তে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাযত  করুন- আমীন!

মুহাসাবা বা আত্মপর্যালোচনা : প্রয়োজন ও পদ্ধতি




মৃত্যু সুনিশ্চিত বিষয়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا، وزنوا أعمالكم قبل أن توزنوا، وتزينوا للعرض الأكبر، يوم لا تخفى عليكم خافية.
‘তোমাদের কাছে হিসাব চাওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের হিসাব সম্পন্ন করে নাও, তোমাদের আমল ওজন করার আগে নিজেরাই নিজেদের আমলসমূহ ওজন করে নাও, কিয়ামত দিবসে পেশ হওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো।সুসজ্জিত হও সেদিনের জন্য, যেদিন তোমাদের সামনে কোনো কিছু অস্পষ্ট থাকবে না।’
মায়মূন ইবন মিহরান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
لاَ يَكُونُ العَبْدُ تَقِيًّا حَتَّى يُحَاسِبَ نَفْسَهُ كَمَا يُحَاسِبُ شَرِيكَهُ مِنْ أَيْنَ مَطْعَمُهُ وَمَلْبَسُهُ.
‘সে অবধি কোনো ব্যক্তি মুত্তাকী বা আল্লাহভীরু হতে পারবে না যাবৎ সে নিজেই নিজের হিসেব নেয় বা মুহাসাবা করে। যেভাবে সে তার সঙ্গীর সঙ্গে হিসেব করে কোথায় তার আহার আর কোথায় তার পোশাক।’
মৃত্যু আসবেএতে কোনো সন্দেহ নেই। নেই কোনো দ্বিধা বা সংশয়। এ ব্যাপারে কেউ দ্বিমত পোষণ করে নি। মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করেছে, রাসূলকে অস্বীকার করেছে, কিন্তু মৃত্যুকে কেউ অস্বীকার করতে পারে নি। পৃথিবীতে আসলে একদিন যেতে হবে, মৃত্যুর তেতো স্বাদ নিতে হবে এ কথা সবাই মানে। আবার এ ব্যাপারেও সবাই একমত, ‘মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট সময় নেই। হতে পারে মৃত্যু এখনই এসে পড়বে কিংবা এক মিনিট, এক ঘন্টা, একদিন, এক সপ্তাহ অথবা এক বছর পর আসবে। কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিজ্ঞানের গবেষণা উৎকর্ষের চরম সীমায় পৌঁছলেও ‘কে কখন কোথায় মরবে’ এ তথ্য দিতে পারছে না।
মৃত্যুর পূর্বেই মরার ব্যাখ্যা
মৃত্যুর আগমন যেহেতু সন্দেহাতীত, এর দিন-ক্ষণ জানাও সাধ্যাতীত, তাই অপ্রস্তুত অবস্থায় যদি কেউ মারা যায়, আল্লাহ জানেন ওপারে সে কোনো অবস্থার সম্মুখীন হবে। এমন যেন না হয়, ওপারে পৌঁছে আল্লাহর আযাব বা ক্রোধের মুখে পড়তে হয়। অসন্তোষ বা অশান্তির মুখোমুখি হতে হয়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ সাহাবী বলেন, এই রুঢ় বাস্তব ‘মৃত্যু’ আসার পূর্বেই মরো।
কিভাবে মরবে?মরার আগে মরার ব্যাখ্যা কী?উলামায়ে কেরাম এর দু’ রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এক. প্রকৃত মৃত্যু আগমনের পূর্বে আল্লাহর নির্দেশের সাথে সাংঘর্ষিক এবং এর পরিপন্থি মনের সকল কামনা-বাসনা এবং পাপ, নাফরমানীও অবৈধ কাজ করার যে চাহিদা সৃষ্টি হয়, সব কিছুকে পদদলিত ও মথিত করে দাও। ধ্বংস ও বিনাশ করে দাও। দুই. মরণের আগে মরণের চিন্তা ও ধ্যান করো। চিন্তা করো, একদিন আমাকে এ জগৎ ছেড়ে যেতে হবে খালি ও রিক্ত হাতে। টাকা-পয়সা সাথে যাবে না। সন্তানাদি, কুঠি-বাংলো, বন্ধু-বান্ধব কেউ সাথে যাবে না, বরং যেতে হবে একাকী, শূন্য হাতে। এসব একটু ভেবে দেখো।
বাস্তব কথা হলো, পৃথিবীতে আমাদের মাধ্যমে যত অনাচার, পাপাচার সংঘটিত হয়, গুনাহ নাফরমানী প্রকাশ পায় এর বড় কারণ হলো, ‘মৃত্যুকে ভুলে যাওয়া’। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, স্বাস্থ্য ভালো আছে, হাত-পা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সচল আছে, ততদিন মানুষ নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবে। আকাশ কুসুম কল্পনা ফাঁদে। অহংকার ও আত্মগৌরব করে।অন্যের ওপর জুলুম করে।অপরেরঅধিকার হরণ করে। মানুষ এসব যৌবনকালে অবলীলায় করতে থাকে। ‘তাকে একদিন মরতে হবে’ এ কথা তার কল্পনাতেই আসে না। আপনজনের জানাযা বহন করে, নিজ হাতে প্রিয়জনকে কবরস্থ করে, তবুও ভাবনার পরিবর্তন হয় না। মনে করে, সেই তো মরেছে, আমি তো আর মরি নি। এভাবে উদাসীনতা ও অন্যমনস্কতার ভেতর দিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়, ফলে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পায় না।
দু’টি বড় নেয়ামত ও আমাদের উদাসীনতা
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ ، الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ » .
‘আল্লাহর দেয়া দু’টি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ লোকই প্রবঞ্চনায় লিপ্ত। এক. সুস্থতার নেয়ামত। দুই. অবসরের নেয়ামত।[1]
মনে হয় ‘সুস্থতার নেয়ামত চিরকালই অক্ষুন্ন থাকবে’।ফলে সুস্থকালে পুণ্য ও নেকীর কাজের তাগাদা বোধ হয় না। কাল করব, পরশু করব- এভাবে পেছায়। এক সময় নেয়ামত ফুরিয়ে যায়। অনুরূপভাবে ‘অবসর বা সুযোগ’ নেয়ামতেরও মূল্যায়ন করা হয় না। এখন কাজ করার সময় ও সুযোগ আছে; কিন্তু মানুষ ভালো কাজ  করে না এ ভেবে যে, এখনো সময় আছে; পরে করে নেব ইত্যাদি।
যৌবন এখনো অটুট আছে, তারুণ্যের ইস্পাত শক্তি বলে বলবান তরুণ পাহাড়-পর্বত বয়ে নিয়ে যেতে পারে। অনেক শ্রম ও কষ্টসাধ্য কাজ করতে পারে।চাইলে এই যৌবনে অনেক ইবাদত করতে পারে। আল্লাহর পথে ত্যাগ ও সাধনা করতে পারে। সৃষ্টির সেবা করতে পারে। আল্লাহকে খুশি করার জন্য আমলমানায় নেকীর স্তুপ গড়তে পারে। কিন্তু মস্তিষ্কে এ কথা বসে গেছে, আমি এখনো যুবক আছি, এখন একটু যৌবনের স্বাদ গ্রহণ করি। ইবাদত-বন্দেগী ও নেক কাজ করার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে। এগুলো পরে করবো। এভাবে সে নেক কাজ টলাতে থাকে। যৌবন কখন শেষ হয়ে যায় তা টেরই পায় না। দুর্বল হয়ে পরে। ফলে ইবাদত ও নেক কাজ করার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর করতে পারে না। কারণ এখন তার দেহে শক্তি নেই। স্বাস্থ্য ভালো নেই।অবসরের সংকট ও কাজের ব্যস্ততা এতো বেশি যে, এসবের জন্য সময়ই বের করতে পারে না। এর একমাত্র কারণ হলো, মানুষ মৃত্যু থেকে উদাসীন। মৃত্যুর কথা স্মরণ করে না।
শায়খ বাহলুল রহ. -এর শিক্ষামূলক ঘটনা
বাদশা হারুনুর রশীদের আমলে ‘বাহলুল’ নামক বড় এক আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি ছিলেন। আল্লাহর মহব্বতে পাগল এ বুযুর্গের সাথে বাদশা হাস্য-কৌতুক করতেন। পাগল হলেও জ্ঞানী সুলভ কথা বলতেন। বাদশা তার প্রহরীকে বলে রেখেছিলেন, এ ব্যক্তিটি আমার সাক্ষাতে যখনই আসতে চায়, তখনই তাকে আসতে দিও। সুতরাং যখন খুশি তিনি রাজ দরবারে হাজির হতেন।
একদিন তিনি দরবারে প্রবেশ করে বাদশা হারুনুর রশীদের হাতে একটি ছড়ি দেখতে পেলেন। হারুনুর রশীদ কৌতুক করে বললেন, ‘বাহলুল সাহেব তোমার কাছে একটা অনুরোধ রাখব’।বাহলুল বললেন, কী অনুরোধ? হারুনুর রশীদ তাকে ছড়িটি দিয়ে বললেন, ‘এটা তোমাকে আমানত স্বরূপ দিচ্ছি’।পৃথিবীর বুকে তোমার চেয়ে বড় কোনো বেকুব যদি খুঁজে পাও তাকে আমার পক্ষ থেকে এটি উপহার দেবে।’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে’ বলে ছড়িটি বাহলুল নিজের কাছে রেখে দিল। আসলে বাদশা ঠাট্টা করে বাহলুলকে এটাই বুঝাতে চাচ্ছিলেন যে, তোমার চেয়ে বড় নির্বোধ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। যা হোক তখনকার মতো বাহলুল ছড়ি নিয়ে দরবার থেকে চলে গেল।
কয়েক বছর পরের ঘটনা। একদিন বাহলুল জানতে পারল, হারুনুর রশিদ খুব অসুস্থ, শয্যাশায়ী। তাঁর চিকিৎসা চলছে, কিন্তু কোনো ফল দিচ্ছে না। বাহলুল বাদশার শুশ্রুষার জন্য তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমিরুল মুমিনীন কেমন আছেন?’ বাদশা বললেন, ‘অবস্থা আর কি, সামনে সুদূর সফর উপস্থিত’।
– বাহলুল জিজ্ঞেস করল, ‘কোথাকার সফর?’
– আখেরাতের সফর! এখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছি।
–  কতদিন পর ফিরে আসবেন?
– আরে ভাই! এটাতো আখেরাতের সফর। এ সফরে গেলে কেউ আর ফিরে আসে না।
– আচ্ছা আপনি তো এ সফর থেকে আর ফিরবেন না, তাই সফরে আরাম ও সুবিধার জন্য কী কী ব্যবস্থা করেছেন?
– তুমি দেখি আবার নির্বোধের মত কথাবার্তা বলতে শুরু করেছ। আখেরাতের সফরে কেউ সঙ্গে যেতে পারে নাকি? এ সফরে বডিগার্ড, সৈন্য-লশকর কেউ সাথে যেতে পারে না। সঙ্গীহীন একাকী যেতে হয়। এ এক মহা সফর।
– এত দীর্ঘ সফর! সেখান থেকে আর ফিরবেন না, তবুও সৈন্য-সামন্ত কিছু পাঠালেন না? অথচ ইতোপূর্বে সব সফরেই এর যাবতীয় ব্যবস্থাপনার জন্য আগে থেকেই আসবাব-পত্র ও সৈন্য-সামন্ত প্রেরণ করতেন। এ সফরে কেন পাঠালেন না?
– এটা এমন সফর যে, এতে সৈন্য পাঠানো যায় না।
– জাঁহাপনা! বহুদিন হলো আপনার একটি আমানত আমার কাছে রয়ে গেছে। সেটি একটি ছড়ি। আমার চেয়ে বড় কোনো নির্বোধ পেলে এটা তাকে উপহার দিতে বলেছিলেন। আমি অনেক খুঁজেছি কিন্তু আপনার চেয়ে বড় নির্বোধ আর কাউকে পেলাম না। কারণ, আমি দেখেছি আপনি কোনো সংক্ষিপ্ত সফরে গেলেও মাস খানেক পূর্ব থেকেই তার প্রস্তুতি চলত। পানাহারের আসবাব, তাবু, সৈন্য, বডিগার্ড ইত্যাদি আগে থেকেই পাঠানো হতো। আর এখন এতো দীর্ঘ সফর, যেখান থেকে ফেরার সম্ভাবনাও নেই, অথচ এর জন্য কোনো প্রস্তুতি নেই। আপনার চেয়ে বড় বোকা জগতে আর কে আছে? অতএব আপনার আমানত আপনাকেই ফেরৎ দিচ্ছি। এসব শুনে বাদশা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং বিলাপ করে বলতে লাগলেন, বাহলুল! তুমি সঠিক বলেছো। আজীবন তোমাকে বোকা ভেবেছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো তুমি বুদ্ধিমান। তুমি প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বলেছ। বাস্তবেই আমি সারা জীবন বৃথা কাটিয়েছি। আখেরাতের কোনো প্রস্তুতি নেই নি।
প্রকৃত জ্ঞানী কে?
বাহলুল যা বলেছেন, তা একটি হাদীসের মর্মকথা। শাদ্দাদ ইবন আউস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
« الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ ».
‘প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য নেক কাজ করেছে। আর অক্ষম সেই যে নিজের নফসকে প্রবৃত্তির পেছনে পরিচালিত করে এবং আল্লাহর কাছে কেবল প্রত্যাশা করে।’[2]
হাদীসে নফসকে নিয়ন্ত্রণের অর্থ হলো, কিয়ামতের দিন হিসাব নেয়ার আগে দুনিয়ায় নিজেই নিজের হিসেব নেয়া তথা মুহাসাবা করা।
উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘প্রকৃত জ্ঞানী’র পরিচয় দিয়েছেন। অথচ যে ব্যক্তি পৃথিবীতে বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারে, টাকা থেকে টাকা কামাই করতে পারে, দুনিয়াকে বোকা বানিয়ে দিতে পটু, তাকেই বুদ্ধিমান ও জ্ঞানি মনে করা হয়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত হাদীসে বলেছেন, প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফস তথা মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং প্রবৃত্তির সকল চাহিদার পেছনে না চলে নফসকে আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুগামী বানায়, মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এর ব্যতিক্রম হলে সে নির্বোধ-বোকা। কারণ সে সারাটা জীবন অর্থহীন কাজে ব্যয় করল কিন্তু চিরকাল যেখানে থাকতে হবে তার জন্য কোনো পাথেয় সংগ্রহ করল না।
আমরা সবাই বোকা
হারুনুর রশীদকে বাহলুল যা বলেছেন, গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য বলে মনে হবে। পৃথিবীতে বসবাসের জন্য সবাই চিন্তা করে, সে কোথায় বাড়ি বানাবে? কেমন গৃহ নির্মাণ করবে? সুখ ও বিলাসিতার কী কী উপকরণ সংগ্রহ করবে? কোথাও ভ্রমণে গেলে ‘সিট পায় কি না’ এই ভয়ে আগেই টিকিট বুকিং করে, প্রস্তুতি  শুরু করে। যেখানে যাচ্ছে সেখানে সংবাদ পাঠায়। হোটেলে বুকিং করায়। মাত্র তিন দিনের সফরেও এসব প্রস্তুতি নেয়া হয়।
অথচ যেখানে অনন্তকাল থাকতে হবে, যে জীবনের শুরু আছে শেষ নেই, তার কোনো চিন্তাই করে না যে, সেখানে কেমন ঘর নির্মাণ করবে? সেখানকার জন্য কিভাবে বুকিং করবে?
উপরোক্ত হাদীসটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, জ্ঞানী ব্যক্তি সেই, যে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়। অন্যথায় সে হলো বেকুব। চাই সে যতবড় বিত্তশালী বা পুঁজিপতিই হোক না কেন। আর আখেরাতের প্রস্তুতির পথ এটিই যে, ‘মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর ধ্যান করবে’।এ কথা চিন্তা করবে যে, ‘একদিন আমাকে মরতে হবে’।
মৃত্যু এবং আখেরাতের মুহাসাবা বা কল্পনা করার পদ্ধতি
সারাদিনের মধ্যে একটি নির্জন-নিভৃত সময় বের করে এভাবে কল্পনা করা, ‘আমার অন্তিম মুহূর্ত এসে গেছে, জান কবজ করার জন্য ফেরেশতারা উপস্থিত হয়েছেন, আমার জান বের করেছে, আত্মীয়-স্বজন গোসল ও কাফন-দাফনের ব্যবস্থায় লেগে গেছে, কাফন পরিয়ে নিয়ে গেছে, জানাযার নামায পড়ে কবরে রেখেছে, অতঃপর কবর বন্ধ করে দিয়েছে, ওপর থেকে মাটি দিয়ে সেখান থেকে চলে গেছে, অন্ধকার কবরে এখন আমি একা, শুধুই একা। অতঃপর ফেরেশতাগণ এসে প্রশ্নোত্তর শুরু করেছে।’
এরপর আখেরাত কল্পনা করা যে, ‘আমাকে কবর থেকে পুনরায় উঠানো হয়েছে, হাশরের মাঠ কায়েম হয়েছে, সব মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়েছে, সেখানে প্রচণ্ড গরম লাগছে, দরদর করে ঘাম বয়ে পড়ছে, সূর্য একেবারে নিকটে এসেছে, সবাই দুশ্চিন্তা ও টেনশনে ভুগছে, তখন তারা নবীগণের কাছে গিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার আবেদন করছে।’
এভাবে হিসাব-কিতাব, পুলসিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদির কল্পনা করা।রোজ ফজরের পর কুরআন তেলাওয়াত, মাসনূন দু‘আ এবং যিকির-আযকার শেষ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করা, এ সময় অবশ্যই আসবে। জানা নেই কখন আসবে। হতে পারে এখনই আসবে, আজই আসবে। এসব কল্পনা করে দু‘আ করা, ‘হে আল্লাহ, আমি দুনিয়াবী কাজ-কর্মের জন্য বের হচ্ছি। আমার দ্বারা যেন এমন কোনো কাজ সংঘটিত না হয়, যা আমার আখেরাতকে বরবাদ ও ধ্বংস করে দেয়।’
প্রতিদিন এভাবে ধ্যান করতে থাকা।একবার যদি মৃত্যুর চিন্তা অন্তরে বসে যায়, তাহলে আত্মশুদ্ধির দিকে মনযোগ যাবে এবং আখেরাতের চিন্তা মাথায় আসবে ইনশাআল্লাহ।
আব্দুর রহমান ইবন আবী নয়ীম রহ.
আব্দুর রহমান ইবন আবী নয়ীম রহ. একজন বড় বুযুর্গ মুহাদ্দিস ছিলেন। তাঁর জীবনকালে এক ব্যক্তি মনে মনে ভাবলো, আমি বিভিন্ন আলেম, মুহাদ্দিস, ফকীহ ও বুযুর্গের কাছে প্রশ্ন করব যে, যদি জানতে পারেন ‘আগামীকাল আপনার মৃত্যু হবে’। জীবনের শুধুমাত্র একদিন বাকি আছে। তবে আপনারা কীভাবে সে দিনটি কাটাবেন?প্রশ্নের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তাঁরা যেসব ভালো ভালো কাজের কথা বলবেন,  তা সে নিজেও করবে। অতঃপর তাঁদেরকে প্রশ্ন করে বিভিন্ন আমলের কথা জানতে পারলেন।
এক পর্যায়ে যখন শায়খ আবদুর রহমান ইবন আবী নয়ীম রহ. এর কাছে গিয়ে এ প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বললেন, প্রতিদিন যে কাজ করি সেদিনও তাই করব। কারণ, আমি প্রথম দিন থেকেই নিজের কর্মসূচী ও কাজের রুটিন এ ধারণাকে সামনে রেখে বানিয়ে নিয়েছি যে, ‘হতে পারে এটাই আমার জীবনের শেষ দিন’।‘হতে পারে আজই আমার মরণ এসে পড়বে’।এই সূচিতে পরিবর্তন বা সংযোজন করার মত কোনো সুযোগ নেই। প্রতিদিন যা করি জীবনের শেষ দিনও তাই করব।
এটাই হলো “মূ-তূ ক্ববলা আন তা মূ-তূ”বা ‘মরার আগেই মরো’র বাস্তব নমুনা। এসব মহা মনীষী মৃত্যুর চিন্তা ও আখেরাতের খেয়াল দ্বারা নিজের জীবন এমনভাবে ঢেলে সাজিয়েছিলেন যে, সর্বক্ষণ মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতেন। মৃত্যু যখনই আসতে চায় আসুক।
প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের বাসনা
উবাদা ইবন ছামিত রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
« مَنْ أَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ أَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ ، وَمَنْ كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ كَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ » . قَالَتْ عَائِشَةُ أَوْ بَعْضُ أَزْوَاجِهِ إِنَّا لَنَكْرَهُ الْمَوْتَ . قَالَ « لَيْسَ ذَاكَ ، وَلَكِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا حَضَرَهُ الْمَوْتُ بُشِّرَ بِرِضْوَانِ اللَّهِ وَكَرَامَتِهِ ، فَلَيْسَ شَىْءٌ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ ، فَأَحَبَّ لِقَاءَ اللَّهِ وَأَحَبَّ اللَّهُ لِقَاءَهُ ، وَإِنَّ الْكَافِرَ إِذَا حُضِرَ بُشِّرَ بِعَذَابِ اللَّهِ وَعُقُوبَتِهِ ، فَلَيْسَ شَىْءٌ أَكْرَهَ إِلَيْهِ مِمَّا أَمَامَهُ ، كَرِهَ لِقَاءَ اللَّهِ وَكَرِهَ اللَّهُ لِقَاءَهُ »
‘যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে পছন্দ করে, আল্লাহর মিলন প্রত্যাশী হয়, আল্লাহ তা‘আলাও তার সাক্ষাতে আগ্রহী হন। আর যে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপ্রিয় ভাবে, আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।’ এ কথা শুনে আয়েশা কিংবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্য কোনো স্ত্রী বললেন, আমরা তো মৃত্যু অপ্রিয়ই জ্ঞান করি।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটা নয় ; বরং ব্যাপার হলো, যখন মু’মিনের সামনে মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর পুরস্কারের সুসংবাদ দেয়া হয়।তখন তার কাছে কোনো জিনিসই এর চেয়ে প্রিয় মনে হয় না। ফলে সে আল্লাহর সাক্ষাত পছন্দ করে আর আল্লাহও তার সাক্ষাত পছন্দ করেন। পক্ষান্তরে কাফের ব্যক্তির সামনে যখন মৃত্যু উপস্থিত, তখন তাকে আল্লাহর শাস্তি ও আযাবের দুঃসংবাদ শোনানো হয়, এমতাবস্থায় তার কাছে এর চেয়ে অপ্রিয় আর কিছু মনে হয় না। ফলে সে আল্লাহর সাক্ষাতকে অপছন্দ করে আর আল্লাহও তার সাক্ষাতকে অপছন্দ করেন।[3]
সুতরাং এমন সৌভাগ্যবান প্রকৃত মু’মিন মাত্রেই সর্বদা মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকেন। তাদের অবস্থাই যেন এ কথা বলছে কবি যেমন বলেন,
          কালকে আমার মিলন হবে বন্ধুসনে,
          দেখব আমি নবী ও তাঁর সঙ্গীগণে।
অর্থাৎ, আগামীকাল আপন প্রিয়জন তথা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের সাথে সাক্ষাত হবে। এই মৃত্যু চিন্তার প্রভাবেই মানুষের জীবন সুন্নত ও শরীয়তের রাজপথে উঠে আসে এবং তাকে সর্বক্ষণ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত রাখে।
যা হোক প্রতিদিন কিছু সময় বের করে মৃত্যুর কল্পনা করতে হবে। ভাবতে হবে ‘মৃত্যু আসছে, আমি কি প্রস্তুত হয়েছি?’
আজই নিজের হিসাব কষে নিতে হবে
আলোচ্য বাণীর দ্বিতীয়াংশে বলা হয়েছে, কিয়ামত দিবসে হিসাব গ্রহণের আগেই তুমি তোমার হিসাব নাও। আখেরাতে প্রতিটি কর্মের হিসাব নেয়া হবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿فَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٍ خَيۡرٗا يَرَهُۥ ٧ وَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٖ شَرّٗا يَرَهُۥ ٨ ﴾ [الزلزلة: ٧،  ٨] 
‘অতএব, কেউ অণু পরিমাণ ভালোকাজ করলে তা সে দেখবে, আর কেউ অণু পরিমাণ খারাপ কাজ করলে তাও সে দেখবে’।{সূরা আয-যিলযাল, আয়াত : ৭-৮}
অর্থাৎ, তোমরা যে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করেছ তা সামনে আসবে, আর যে মন্দ কাজ করেছ তাও সামনে উপস্থিত পাবে। কবি খুব সুন্দর করে বলেছেন,
                   প্রতিদান দিবসেতে হবে যা
                   আজই হয়েছে বলে ভাব তা।
‘কিয়ামতের দিন হিসাব নেয়ার আগেই নিজের হিসাব নেয়া শুরু করো’ প্রত্যহ রাতে মনকে জিজ্ঞেস করো, আজ সারাটা দিন এমন কী কী কাজ করেছি, যে ব্যাপারে কিয়ামতের দিন প্রশ্ন করা হলে আমি উত্তর দিতে পারব না। এভাবে প্রতিদিন করতে থাক।
সাতসকালে মনের সঙ্গে অঙ্গীকার
ইমাম গাযালী রহ. মুহাসাবা ও আত্মশুদ্ধির এক বিরল ও বিস্ময়কর পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। আমরা এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে তা অব্যর্থ প্রতিষেধক হিসেবে কাজ দেবে। এ থেকে আর কোনো ভালো পদ্ধতি পাওয়া মুশকিল।
সেটি হলো প্রতিদিন কয়েকটি কাজ করবে। প্রথম কাজ হলো, ‘সকালে ঘুম থেকে জেগে নফসের কাছে এ মর্মে অঙ্গীকার নেবে যে, আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো গুনাহ করব না। আমার দায়িত্বে যত ফরয, ওয়াজিব এবং সুন্নাত আছে সব ঠিকমত আদায় করব। আমার ওপর আল্লাহর যত হক আছে, বান্দার হক আছে সব পুরোপুরি আদায় করব। হে নফস! মনে রেখ, ভুলক্রমে অঙ্গীকারের বিপরীত কোনো কাজ করলে তোমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।’ এই হলো প্রথম কাজ এর নাম দিয়েছেন তিনি ‘মুশারাতা’ বা ‘আত্ম অঙ্গীকার’।
অঙ্গীকারের পর দু‘
ইমাম গাযালী রহ. এর কথার সাথে একটু সংযোগ করে বলা যায়, এই ‘আত্ম অঙ্গীকারের’ পর আল্লাহর কাছে দু‘আ করা, ‘হে আল্লাহ, আজ আমি গুনাহ করব না বলে অঙ্গীকার করেছি। আমি সব ফরজ, ওয়াজিব আদায় করব। শরীয়ত অনুযায়ী চলবো। হুকুল্লাহ এবং হুকুকুল ইবাদ সঠিকভাবে আদায় করবো। কিন্তু ইয়া মাবুদ, আপনার তাওফীক ছাড়া এই প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যেহেতু আমি পণ করেছি, তাই আপনি আমাকে তাওফীক দিন। আমাকে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা থেকে রক্ষা করুন। পুরোপুরিভাবে এ প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন।
পুরো দিন নিজের আমলের ‘মুরাকাবা’
এ দু‘আ করে জীবিকার জন্য বেরিয়ে যাও। চাকরি করলে চাকরিতে, ব্যবসা করলে ব্যবসায়, দোকান করলে দোকানে চলে যাও। সেখানে গিয়ে এই কাজ করো যে, প্রতিটি কাজ শুরু করার আগে একটু ভেবে দেখ, এই কাজটি প্রতিজ্ঞার খেলাফ কি-না। এই শব্দ যা উচ্চারণ করছি তা প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী কি-না। যদি প্রতিজ্ঞা পরিপন্থী মনে হয় তাহলে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করো। এটাকে তিনি বলেছেন ‘মুরাকাবা’।এটাই হলো দ্বিতীয় কাজ।
শোয়ার আগে ‘মুহাসাবা’
তৃতীয় কাজটি করতে হবে শোয়ার আগে, আর তা হলো ‘মুহাসাবা’ অর্থাৎ নফসকে বলবে, তুমি সারাদিন গুনাহ করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। প্রতিটি কাজ শরিয়তমত করবে। হুকুকুল্লাহ তথা আল্লাহর হক ও হুকুকুল ইবাদ তথা বান্দার হক ঠিক মত আদায় করবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলে। এখন বলো কোন কাজ তুমি প্রতিজ্ঞামত করেছ, আর কোন কাজ প্রতিজ্ঞামত কর নি? এভাবে সারাদিনের সকল কাজের হিসাব গ্রহণ করবে। সকালে যখন বাড়ি ত্যাগ করলে তখন অমুক লোককে কি বলেছ? চাকরি ক্ষেত্রে গিয়ে নিজ দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছ? ব্যবসা কীভাবে পরিচালনা করেছ? হালালভাবে না হারাম পদ্ধতিতে? যত লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে তাদের হক কিভাবে আদায় করেছ? বিবি, বাচ্চার হক কিভাবে আদায় করেছ? এভাবে যাবতীয় কাজের হিসাব নেয়াকে ‘মুহাসাবা’ বলা হয়।
অতঃপর শুকরিয়া আদায় কর
এই ‘মুহাসাবা’র ফলাফল যদি এই হয় যে, ‘সকালের প্রতিজ্ঞায় তুমি সফল’ তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো।বলো, হে আল্লাহ! তোমার অশেষ শুকরিয়া যে, তুমি আমাকে প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দিয়েছ। (আল্লহুম্মা লাকাল হামদু ওয়া লাকাশ শুকুর) শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তা‘আলা তা বৃদ্ধি করে দেন। তাই আগামী দিনেও প্রতিজ্ঞায় অটল থাকার তাওফীক দেবেন।
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,
﴿وَإِذۡ تَأَذَّنَ رَبُّكُمۡ لَئِن شَكَرۡتُمۡ لَأَزِيدَنَّكُمۡۖ وَلَئِن كَفَرۡتُمۡ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٞ ٧ ﴾ [ابراهيم: ٧] 
‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’।{সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ৭}
অতএব প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকার এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে ভবিষ্যতে নেয়ামত বৃদ্ধি করা হবে এবং অতিরিক্ত নেকীও অর্জন হবে।
অন্যথায় তাওবা কর
‘মুহাসাবা’র ফলাফল যদি এই দাঁড়ায় যে, অমুক স্থানে প্রতিজ্ঞার পরিপন্থী কাজ করেছো, অমুক সময় প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছো, পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছো এবং স্বীয় কৃত প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকতে পারো নি, তাহলে তৎক্ষণাৎ তাওবা করো, বলো, ‘হে আল্লাহ! আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায়, প্রবৃত্তির তাড়নায় প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকতে পারিনি। হে মাবুদ! আমি তোমার কাছে তাওবা করছি এবং ক্ষমা চাচ্ছি। তুমি আমার তাওবা কবুল করে আমার পাপ মাফ করে দাও। ভবিষ্যতে আমাকে প্রতিজ্ঞার ওপর অটল থাকার তাওফীক দান করো।
নফসকে শাস্তি প্রদান কর
তাওবার সাথে সাথে নফসকে একটু শাস্তিও দাও। নফসকে বলো, তুমি প্রতিজ্ঞার খেলাফ কাজ করেছ, সুতরাং শাস্তি স্বরূপ তোমাকে আট রাকাত নফল সালাত আদায় করতে হবে। এ শাস্তিটা প্রভাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার সময়ই নির্ধারণ করো। সুতরাং রাতে নফসকে বলবে, তুমি নিজের সুখ-শান্তির জন্য, সামান্য আনন্দ উপভোগের জন্য আমাকে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে লিপ্ত করেছ। অতএব এখন তোমাকে সাজা ভোগ করতে হবে। তোমার শাস্তি হলো, এখন শোয়ার আগে আট রাকাত নফল সালাত আদায় করো। তারপর বিছানায় যাও। এর আগে বিছানায় যাওয়া নিষেধ।
শাস্তি হওয়া চাই পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ
আমার সম্মানিত উস্তাদ বলতেন, এমন শাস্তি নির্ধারণ করো যা হবে ভারসাম্যপূর্ণ, সঙ্গতিপূর্ণ ও পরিমিত। এতো বড় ধরনের শাস্তি দিও না যে, নফস বিগড়ে যায়। আবার এতো ছোট ও হালকা শাস্তি দিও না যে, তাতে নফসের কোনো কষ্টই না হয়।
হিন্দুস্তানে স্যার সৈয়দ আহমদ আলীগড় কলেজ প্রতিষ্ঠাকালে নিয়ম করলেন, প্রত্যেক ছাত্রকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করতে হবে। যারা সালাতে অনুপস্থিত থাকবে তাদের জরিমানা দিতে হবে। এক ওয়াক্ত সালাতের জরিমানা সম্ভবত এক আনা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফল দাঁড়ালো উল্টা। যেসব ছাত্রের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল, তারা এক মাসের সব সালাতের জরিমানা অগ্রিম জমা দিয়ে বলতো, এই হলো এক মাসের সমুদয় সালাতের জরিমানা। সুতরাং একমাস সালাত আদায় থেকে ছুটি।
তিনি রহ. বলতেন, এত অল্প ও মামুলি অর্থদণ্ড হওয়া সমীচীন নয়, যা একেবারেই জমা দিতে পারে। আবার এত বেশি হওয়াও ঠিক নয় যে, মানুষ তা থেকে পলায়ন করে। বরং মধ্যম ধরনের ও ভারসাম্যপূর্ণ শাস্তি নির্ধারণ করা উচিৎ। উদাহরণ স্বরূপ যেমন আট রাকাত নফল সালাত শাস্তি নির্ধারণ করা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাজা।
একটু সাহস করতে হবে
মোটকথা, আত্মশুদ্ধি করতে হলে হাত-পা নাড়াতে হবে, একটু একটু হিম্মৎ করতে হবে, কমবেশি কষ্ট সহ্য করতে হবে এবং এর জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও দুরন্ত ইচ্ছা করতে হবে। শুধু ঘরে বসে বসে নফসের তাযকিয়া ও পরিশুদ্ধি হতে পারে না। তাই শাস্তি নির্ধারণ করে নাও যে, নফস ভুল পথে গেলে আট রাকাত নফল সালাত তাকে অবশ্যই পড়তে হবে। নফস যখন বুঝতে পারবে যে, আট রাকাত নফল পড়ার নতুন আপদ খাড়া হয়েছে, তখন সে ভয়ে গুনাহ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। নিজের নফস এভাবে আস্তে আস্তে সঠিক পথে উঠে আসবে। ভবিষ্যতে আর তোমাকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করবে না ইনশাল্লাহ।
করতে হবে শুধু চারটি কাজ
ইমাম গাযালী রহ. -এর উপদেশের সার সংক্ষেপ হলো, ‘মাত্র চারটি কাজ করো’।এক. সকালে মোশারাতা বা আত্ম অঙ্গীকার।দুই. সব কাজের সময় মুরাকাবা। তিন. রাতে শোয়ার আগে মুহাসাবা। চার. নফস প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলে মো‘য়াকাবা বা শাস্তি প্রদান।
ধারাবাহিকভাবে এ আমল করে যেতে হবে
একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, শুধু দু’চারদিন এ আমল করে এ কথা ভাবা উচিৎ নয় যে, ব্যাস আমি পূর্ণতায় পৌঁছে গেছি, আমি বুযুর্গ হয়ে গেছি। বরং ধারাবাহিকভাবে এ আমল করে যেতে হবে। কখনো তুমি নফসের ওপর বিজয়ী হবে আবার কখনো শয়তান বিজয়ী হবে। কিন্তু এতে ঘাবড়ালে চলবে না। আমল ছেড়ে দেয়া যাবে না। কারণ, এতে আল্লাহর কোনো রহস্য ও হেকমত লুকায়িত থাকতে পারে। ইনশাআল্লাহ এভাবে জয়-পরাজয় ও উন্নতি-অবনতির পথ ধরে একদিন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।
এ আমল করে প্রথম দিনই যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাও, তবে ‘আমি অনেক বড় কিছু বনে গেছি’- এ ধরনের আত্মতুষ্টি বা হামবড়া ভাব তোমাকে বিভ্রান্ত করবে।সুতরাং এ আমলে কখনো সফলতা আবার কখনো ব্যর্থতার দেখা মিলবে। যেদিন সফলতা আসবে, সেদিন শুকরিয়া আদায় করবে। যেদিন ব্যর্থতা আসবে, সেদিন তওবা-ইস্তেগফার করবে। নিজের নফসের ওপর শাস্তি জারি করবে এবং নিজের খারাপ আমলের ব্যাপারে অনুতাপ ও অনুশোচনা প্রকাশ করবে। ‘এ অনুতাপ মানুষকে নিম্ন থেকে অনেক উচ্চে পৌঁছিয়ে দেয়’।
অনুশোচনা ও তওবা দ্বারা মর্যাদা বৃদ্ধি পায়
মানুষ যদি আপন কৃতকর্মের প্রতি খাঁটি মনে অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার এত বেশি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেবেন, যার কল্পনাই সে করতে পারে না।
শায়খ আবদুল হাই রহ. বলতেন, যখন কোনো বান্দা পাপ করে আল্লাহর কাছে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তা‘আলা সেই বান্দাকে লক্ষ্য করে বলেন, তুমি যে ভুল করে পাপাচারে লিপ্ত হয়েছ, যা তোমাকে আমার সাত্তার (দোষ গোপনকারী) গাফ্ফার (ক্ষমাশীল) ও রহমান (দয়াশীল) গুণের আশ্রয়প্রার্থী বানিয়েছে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর ও মঙ্গলবাহী বনে গেল।
হাদীসে এসেছে, ঈদের দিনে আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের কাছে স্বীয় ইজ্জত ও জালাল তথা মর্যাদা ও মাহত্মের শপথ করে বলেন, আজ এসব লোকেরা সমবেত হয়ে কর্তব্য পালন করছে। আমাকে ডাকছে, ক্ষমা প্রার্থনা করছে এবং কাঙ্ক্ষিত বস্তুর আবেদন জানাচ্ছে। আমার ইজ্জত ও জালালের কছম, আমি তাদের দু‘আ কবুল করব। তাদের গুনাহসমুহকে নেকী দ্বারা বদলে দেব।
যেমন আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, (দীর্ঘ হাদীসের শেষের দিকে গিয়ে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ বলেন,
« فَإِنِّي أُشْهِدُكُمْ يَا مَلَائِكَتِي أَنِّي قَدْ جَعَلْتُ ثَوَابَهُمْ مِنْ صِيَامِهِمْ شَهْرَ رَمَضَانَ وَقِيَامَهُ رِضَائِي وَمَغْفِرَتِي، وَيَقُولُ: يَا عِبَادِي، سَلُونِي فَوَعِزَّتِي وَجَلَالِي لَا تَسْأَلُونِي الْيَوْمَ شَيْئًا فِي جَمْعِكُمْ لِآخِرَتِكُمْ إِلَّا أَعْطَيْتُكُمْ، وَلَا لِدُنْيَاكُمْ إِلَّا نَظَرْتُ لَكُمْ فَوَعِزَّتِي لَأَسْتُرَنَّ عَلَيْكُمْ عَثَرَاتِكُمْ مَا رَاقَبْتُمُونِي، فوَعِزَّتِي لَا أَخْزِيكُمْ وَلَا أَفْضَحُكُمْ بَيْنَ يَدَيْ أَصْحَابِ الْحُدُودِ، انْصَرِفُوا مَغْفُورًا لَكُمْ قَدْ أَرْضَيْتُمُونِي وَرَضِيتُ عَنْكُمْ، فَتَفَرَحُ الْمَلَائِكَةُ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِمَا يُعْطِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ هَذِهِ الْأُمَّةَ إِذَا أَفْطَرُوا مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ» .
‘হে আমার ফেরেশতারা, আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাদের রমযান মাসের সিয়াম সাধনা এবং কিয়ামুল লাইল বা সালাতে রাত্রি জাগরণের বিনিময়ে প্রতিদান এই দিলাম যে তাদের পাপসমূহ মার্জনা করে দিলাম আর আমি তাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম। তারপর তিনি বলেন, হে আমার বান্দা, আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমার ইজ্জত ও জালালের কছম, তোমাদের এই আখিরাতের সমাবেশে আমার কাছে যা-ই চাইবে আমি তা দিয়ে দেব। আর তোমাদের দুনিয়ার যার কথাই বলবে আমি তার প্রতি দৃষ্টি দেব। আমার ইজ্জতের কছম, আমি অবশ্যই তোমাদের ওই অপরাধগুলো ক্ষমা করব যা আমার পর্যবেক্ষণে তোমরা করেছিলে। আমার ইজ্জতের কছম, আমি তোমাদেরকে শাস্তিপ্রাপ্তদের সামনে লজ্জিত করব না, অপমানিত করব না। তোমরা ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে(ঘরে) প্রত্যাবর্তন কর। তোমরা আমাকে সন্তুষ্ট করেছ; আমিও তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি। তখন এই উম্মতের রমযানের সিয়াম সাধনা সমাপ্তিতে আল্লাহ জাল্লা শানুহূর প্রতিদান দেখে ফেরেশতুকূল আনন্দিত হবেন এবং তাঁরা সুসংবাদ পেয়ে আহ্লাদিত হবেন।[4]
এখন প্রশ্ন জাগে, এসব গুনাহ নেকী দ্বারা কিভাবে পরিবর্তন হয়ে যাবে? উত্তর হলো, মানুষ ভুল করে যখন কোনো পাপকাজ করে এবং সে অনুতাপ ও অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যায়, আল্লাহকে কাতরভাবে ডেকে বলে, ‘হে মাবুদ, অজ্ঞাতে অবহেলায় এ অন্যায় করে ফেলেছি। দয়া করে মাফ করেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা শুধু মাফই করেন না, বরং এর বদৌলতে তার মর্যাদাও বৃদ্ধি করে দেন। এভাবে এ গুনাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়ে যায় এবং তার জন্য সুফল হিসেবে আবির্ভূত হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿فَأُوْلَٰٓئِكَ يُبَدِّلُ ٱللَّهُ سَيِّ‍َٔاتِهِمۡ حَسَنَٰتٖۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ٧٠ ﴾ [الفرقان: ٦٩]  
‘তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।{সূরা আল-ফুরকান, আয়াত : ৬৯}
গুনাহ আমার কী ক্ষতি করবে?
ভারতের উত্তর প্রদেশে নাজমুল হাসান নামক একজন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সবসময় নেককার আলেমদের সোহবতে থাকতেন। তিনি একজন বড় মাপের আবেদও ছিলেন। তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন। তাঁর একটি পংক্তি আমার ভালো লাগে এবং বারবার মনে পড়ে। যার অর্থ হলো-
           অনুতাপ প্রকাশের পেয়ে গেছি ধন,
           পাপ আর করবে কি অহিত সাধন।
অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা যেহেতু আমাদেরকে অনুতাপ অনুশোচনা ও রোনাজারি দান করেছেন, আর আমরা দু‘আও করছি, ‘হে আল্লাহ! আমার এ অপরাধ ক্ষমা করে দিন’ তাই এ গুনাহ ক্ষতি করতে পারবে না।
গুনাহ আল্লাহ তা‘আলারই সৃষ্টি। আর হিকমত ছাড়া কোনো কিছুই তিনি সৃষ্টি করেন না। গুনাহ তৈরির হিকমত হলো-গুনাহ করার পর তাওবা করলে, অনুতপ্ত হয়ে কান্নাকাটি করলে এবং ভবিষ্যতে না করার প্রতিজ্ঞা করলে এ তাওবার বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেবেন, যা কল্পনায়ও ছিলো না।
আজীবন লড়াই চলবে
সুতরাং রাতে ‘মুহাসাবা’ করার সময় যখন জানতে পারবে গুনাহ সংঘটিত হয়েছে, তখন তাওবা ও ইস্তেগফার করবে। আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, হতাশ হবে না। কারণ, জীবনটা এক ধরনের লড়াইয়ের নাম। মৃত্যু পর্যন্ত নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। আর লড়াইয়ের অমোঘ নিয়ম হলো, কখনো তুমি জিতবে, কখনো প্রতিপক্ষ জিতবে। তাই শয়তান তোমাকে পরাজিত করলে সাহস হারিয়ে বসে পড়ো না বরং পুনরায় সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে শয়তানের সাথে লড়াই করো। ‘সাহস না হারিয়ে পুনরায় মোকাবেলার জন্য দাঁড়ালে শেষ বিজয় আমাদেরই হবে’ -এ ওয়াদা আল্লাহ তা‘আলা করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿تِلۡكَ ٱلدَّارُ ٱلۡأٓخِرَةُ نَجۡعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوّٗا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَلَا فَسَادٗاۚ وَٱلۡعَٰقِبَةُ لِلۡمُتَّقِينَ ٨٣ ﴾ [القصص: ٨٣] 
‘এই হচ্ছে আখিরাতের নিবাস, যা আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি, যারা যমীনে ঔদ্ধত্য দেখাতে চায় না এবং ফাসাদও চায় না। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য’।{সূরা আল-ক্বাসাস, আয়াত : ৮৩}
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন,
﴿قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِ ٱسۡتَعِينُواْ بِٱللَّهِ وَٱصۡبِرُوٓاْۖ إِنَّ ٱلۡأَرۡضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦۖ وَٱلۡعَٰقِبَةُ لِلۡمُتَّقِينَ ١٢٨ ﴾ [الاعراف: ١٢٨] 
‘মূসা তার কওমকে বলল, ‘আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয় যমীন আল্লাহর। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে তিনি চান তাকে তার উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। আর পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।’ {সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত : ১২৮}
অগ্রসর হও, আল্লাহ স্বাগতম জানাবেন
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿وَٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ فِينَا لَنَهۡدِيَنَّهُمۡ سُبُلَنَاۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٦٩ ﴾ [العنكبوت: ٦٩] 
‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন’।{সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত : ৬৯}
‘যারা আমার পথে জিহাদ করে’ অর্থাৎ নফস ও শয়তানের সাথে তোমরা এভাবে লড়াই করবে যে, শয়তান তোমাদের ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে, আর তোমরা তার মোকাবেলা করছ এবং মরণপণ প্রচেষ্টায় ভ্রান্ত পথ থেকে বেঁচে চলছ, তবে আমার প্রতিশ্রুতি রইল যে, অবশ্যই অবশ্যই আমি প্রচেষ্টাকারী ও লড়াইকারীদের নিজের রাস্তার সন্ধান দেব।
আয়াতটি বুঝাতে একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, শিশু যখন হাঁটা শুরু করে, বাবা-মা তখন তাকে চলতে ও হাঁটতে শেখায়। একটু দূরে দাঁড় করে দিয়ে বলে ‘এদিকে এসো’। বাচ্চা যদি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে এবং সামনে পা না বাড়ায়,তাহলে বাবা-মাও দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে কোলে নেয় না। কিন্তু বাচ্চা এক পা ফেলে অপর পা ফেলতে পড়ে যেতে লাগলে বাবা-মা পড়ে যাওয়ার আগেই তাকে ধরে ফেলে এবং পরম স্নেহে কোলে নেয়। কারণ বাচ্চা তার সাধ্যমত চেষ্টা করেছে।
এমনিভাবে মানুষ আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা করলে, তার পথে পা বাড়ালে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন না, এগিয়ে এসে তাকে ধরবেন না, এমনটি হতেই পারে না। বরং এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ওয়াদা দিচ্ছেন, তোমরা চলতে শুরু করলে আমি এগিয়ে গিয়ে তোমাদের হাত ধরব। সরাসরি তোমাদের সাহায্য করব। অতএব সাহসিকতার সাথে নফস ও শয়তানের মোকাবেলা করো। তাঁর দরবারে হতাশার স্থান নেই। অন্যায় হলেও নিরাশ হয়ো না, চেষ্টা অব্যাহত রাখ। ইনশাআল্লাহ একদিন সফল হবেই।
সারকথা হলো, তুমি তোমার কাজ করো, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কাজ অবশ্যই করবেন।মনে রেখ, তোমার কাজে ত্রুটি হতে পারে কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার কাজে ত্রুটি-বিচ্যুতির কোনো সম্ভাবনা নেই। তুমি পা বাড়ালে তিনি পথ খুলে দেবেন। এ দিকে ইঙ্গিত করেই বলা হয়েছে, মরার আগে মরো আর হিসাবের আগেই হিসাব করো।
আল্লাহর সামনে কী জবাব দেবে?
একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি বলেছেন, মুহাসাবার একটি পদ্ধতি হলো, তুমি কল্পনা করো ‘এখন তুমি হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছো, তোমার হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে, আমলনামা পেশ করা হচ্ছে, তোমার আমলনামায় যেসব অপকর্ম ছিল সকলের সামনে তা উন্মোচিত হচ্ছে এবং আল্লাহ তা‘আলা প্রশ্ন করছেন-এ অপকর্ম তুমি কেন করেছ?’
এর উত্তরে তখন কি বলবে? আজ কোনো মৌলবী সাহেব যখন তোমাকে বলে, অমুক কাজ করো না, দৃষ্টির হেফাজত করো, সুদ-ঘুষ থেকে বেঁচে চলো, মিথ্যা বলো না, গীবত করো না, টিভি দেখো না, বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানাদিতে পর্দাহীনতা থেকে বেঁচে চলো। উত্তরে তোমরা তাদেরকে বলে থাক, আমরা কি করব, যুগটাই খারাপ। পৃথিবী উন্নতি ও সভ্যতার শিখরে পৌঁছে গেছে। মানুষ চাঁদে গেছে। আমরা কি তাদের থেকে পিছিয়ে থাকব? দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে পড়ব? বর্তমান সমাজে চলতে গেলে এসব না করে উপায় নেই।
এ উত্তর মৌলবীদের দিতে পারো। কিন্তু কিয়ামতের ভয়ংকর দিবসে মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর সামনে এ অজুহাত দেখাতে পারবে কি? বুকে হাত দিয়ে চিন্তা করে বলো, এ জবাব যদি সেখানে না চলে এখানে কিভাবে চলবে?
আল্লাহর কাছে সাহস ও প্রত্যয় প্রার্থনা করো
তোমরা যদি আল্লাহর কাছে এ উত্তর দাও যে, ‘হে আল্লাহ! সমাজ ও পরিবেশের কারণে অপারগ হয়ে আমি গুনাহ করতে বাধ্য হয়েছি’।তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, ‘অপারগ তুমি ছিলে না আমি ছিলাম?’ তোমরা উত্তর দেবে, ‘ওহে মাবুদ! আমিই অপারগ ছিলাম’।আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞেস করবেন, ‘তবে তুমি তোমার অপারগতা দূর করার প্রার্থনা করোনি কেন? আমি কি তা দূর করতে সক্ষম ছিলাম না? আমার নিকট দু‘আ করতে, হে আল্লাহ! আমি অপারগ, আপনি আমার অপারগতা দূর করে দিন, নয়তো আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমাকে শাস্তি দেবেন না।
বলুন! আল্লাহ তা‘আলার এ পাল্টা প্রশ্নের কোনো উত্তর আছে কি? না থাকলে একটি কাজ করুন, আর তা হলো, নিজেদেরকে যে কাজ করতে অপারগ দেখছেন, চাই বাস্তব সম্মত অপারগতা হোক আর সামাজিক অপারগতাই হোক এ ব্যাপারে প্রতি দিন দু‘আ করুন, ‘হে আল্লাহ! আমার সামনে এই অপারগতা। আমি এ থেকে বাঁচার সাহস পাচ্ছি না। আপনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এ অপারগতা ও সাহসহীনতা দূর করে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সাহস ও হিম্মৎ দান করুন। আমীন।
আল্লাহর দানের ভাণ্ডারে কোনো অভাব নেই
মোটকথা, আল্লাহর কাছে চাও, প্রার্থনা কর। অভিজ্ঞতার আলোকে প্রমাণিত, আল্লাহর কাছে চাইলে তাকে অবশ্যই দেবেন। না চাইলে দেবেন কী? কবি বলেন-
রোগ যদি কেউ নাহি চেনে, চিকিৎসা তার নাই,
মনে রেখ রবের দানের, নাই তুলনা নাই।
রোগের ব্যথায় কাতরতা না থাকলে, গুনাহ থেকে বাঁচার আকুলতা না থাকলে তাকে চিকিৎসা দেবে কে? প্রার্থনাকারীকে দেয়ার জন্য আল্লাহর ভাণ্ডার সদা উন্মুক্ত।
সকাল-সন্ধ্যা যে চারটি আমলের কথা বলা হলো, এর ওপর আমল করলে আলোচ্য বাণী তথা ‘মরার আগেই মরো, হিসেবের আগেই নিজের হিসাব করো’ অনুযায়ী আমলকারী হিসেবে গণ্য হওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফীক দান করুন, ক্ষমা করুন এবং এসব কথার ওপর আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
(সংকলিত ও সংক্ষেপিত)
[1]. বুখারী: ৬৪১২; তিরমিযী: ২৩০৪।
[2]. তিরমিযী: ২৪৫৯; তাবরানী, মু‘জামুল কাবীর : ৬৯৯৫; মুসতাদরাকআলাস-সাহীহ: ৭৬৩৯; ইমামতিরমিযীবলেন, হাদীসটিকেহাসানসহীহ, তবেবুখারীওমুসলিমএটিসংকলনকরেননি। তালখীসনামক গ্রন্থেইমাম যাহবী হাদীসটিকেসহীহ বলেছেন।
[3].বুখারী : ৬৫০৭; মুসলিম : ৪৮৪৪।
[4]. বাইহাকী, শু‘আবুলঈমান : ৩৪২১; দিমইয়াতী, আত-মুতজিরুর-রাবেহ : ১৩৩।ইবনুলমুনযিরীরহ. বলেন, হাদীসটিইবনহিব্বানসংকলনকরেছেনকিতাবুছ-ছাওয়াবঅধ্যায়ে, তেমনিবাইহাকীহাদীসটিসংকলনকরেছেনফাযাইলুলআওকাতঅধ্যায়ে।হাদীসেরসনদেএমনকেউনেইযার‘যঈফ’ হবারব্যাপারেসবাইএকমত।[আত-তারগীবওয়াত-তারহীব : ২/৬১]

যে সকল কারণে একজন মুসলমান ইসলামচ্যুত হয়ে যায় তথা কাফির হয়ে যায়


শাইখ আব্দুল আজীজ ইবন আবদুল্লাহ ইবনে বা’য(রহ) বলেন: আল্লাহ সকল মানুষকে ইসলামে প্রবেশ করে এর সাথে লেগে থাকতে বলেছেন এবং ইসলামের বিপরীত যে কোন কিছু থেকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। তিনি তার নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে পাঠিয়েছেন মানুষকে ইসলামের পথে ডাকার জন্য। তিনি বলেন যে যারা নবীর অণুসরন করবে তারা সুপথ প্রাপ্ত হবে এবং যারা তার থেকে দূরে সরে যাবে তারা বিপথগামী হবে। কোরআনের বহু আয়াতে তিনি ধর্মত্যাগের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন সকল প্রকার শির্ক ও কুফরি থেকে।
স্কলাররা ধর্মত্যাগের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, একজন মুসলিম ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয় এমন কোন কাজ করলে যা ইসলামবিরোধী। ইসলামকে অকার্যকর করে দেয় এমন কোন কাজ একজন ব্যাক্তিকে ইসলামের সীমা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। (ইসলামের সত্যতার অকাট্য প্রমাণ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও এবং তাকে পুন:পুন: স্পষ্টভাবে বুঝানো সত্যেও) একজন ব্যাক্তি যদি ইসলামচ্যুত তথা মূর্তাদ হয়ে যায় তবে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে তার শাস্তি হল মৃত্যুদ্ন্ড এবং তার সম্পদ সিজ করে নেয়া । এর মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং কমন বিষয় হল দশটি যা মুহামাদ্দ বিন সুলেয়মান আত-তামীমী ও অন্যান্য স্কলার দ্বারা বর্ণিত। এখানে সংক্ষিপ্ত ভাবে এ বিষয় গুলো পেশ করা হল এই আশায় যে আপনারা ইসলামচ্যুতির ভয় থেকে নিরাপদ থাকতে পারবেন।
১- শিরক তথা আল্লাহর সাথে তাঁর ইবাদাতে অন্য কাউকে অংশীদার বানানো।
“নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা, ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়”। (আন-নিসা’ ৪:১১৬)
“নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই”। (মা’য়িদাহ ৫: ৭২)
এর মধ্যে আছে মৃতদের কাছে, জ্বীনদের কাছে বা কবরে প্রার্থনা করা, তাদের সাহায্য খোজা, তাদেরকে উদ্দেশ্য করে মানত করা ও কোরবানী করা।
২- যারা আল্লাহ ও তার মধ্যে যোগাযোগের মধ্যস্থতাকারী (intermediary) রুপে কাউকে বা কোন জিনিসকে বেছে নেয়, তাদেরকে যোগাযোগের মাধ্যম হতে বলে এবং তাদের উপরেই তার আস্থা স্থাপন করে (অর্থাৎ সরাসরি আল্লাহর কাছে চায় না এবং নিজের ঐকান্তিকতার উপর আস্থা স্হাপন করে না) তাদের ব্যাপারে আলেমদের ঐক্যমত হল এই যে, এরা কাফের ।
৩- যারা অংশীদারস্থাপনকারীদের(মুশরিকুন) অস্বীকারকারী(কাফির) মনে করে না, অথবা তাদের কুফরী সন্মন্ধে সন্দেহ পোষন করে অথবা তাদের পদ্ধতিকেও সঠিক মনে করে তারা কাফির।
৪- এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আদর্শের চেয়ে অন্য কোন ব্যক্তির মতাদর্শ উত্তম বা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আনীত জীবন ব্যবস্থার চেয়ে অন্য কোন ধর্ম বা মতবাদ ভাল। যেমন, কেউ যদি বিশ্বাস করে যে, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, ডারউইনের মতবাদ ইত্যাদি ইসলামের চেয়ে ভাল তবে সে মুরতাদ হয়ে যাবে।
“বল! তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রুপ করছিলে? তোমরা আর অজুহাত দাড় করো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ।” (সূরা আত-তাওবা: ৬৫-৬৬)
“তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদেরকে ভালবাসেন না’ (সূরা আলে-ইমরান: ৩২)
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,
“যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হল, তবে আমি তোমাকে তাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি’ (সূরা নিসা: ৮০)
“যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ (আহযাব ৩৬)
৫- রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নির্দেশিত কোন বিষয়কে মনে মনে ঘৃণা করা যদিও সে তা পালন করে। যেমন, কেউ যদি দাঁড়ি, পর্দা ইত্যাদিকে মনে মনে অপছন্দ করে তবে সে মুসলমান থাকবেনা। কারণ, এগুলো ইসলামের আবশ্যপালণীয় নির্দেশ‍।
কেননা আল্লাহ বলেন:
“এটা এজন্যে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব, আল্লাহ তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন” (মুহাম্মাদ ৪৭: ৯)
আবু হুরাইরা রাযি. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে,
“আমার প্রতিটি উম্মত জান্নাতে যাবে। তবে যে অস্বীকার করে সে নয়। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, অস্বীকারকারী কে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে আমার অনুকরণ করল সে জান্নাতে যাবে। আর যে আমার নাফরমানী করল, সে-ই অস্বীকারকারী’ (বুখারী)
► আল্লাহ বলেনঃ
“হে নবী! আপনার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং মু’মিনদের মধ্য থেকে যারা আপানাকে অনুসরণ করে তাদের জন্য।” [সূরা আনফালঃ ৬৪]
৬- নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রচারিত ধর্মের যে কোন বিষয় নিয়ে কেউ যদি মজা করে, অথবা পুরস্কার ও শাস্তি সম্পর্কিত যে কোন বক্তব্য নিয়ে টিটকারী দেয় বা দুষ্টুমি করে, সে কাফির। এর প্রমাণ হল নিচের আয়াতটি:
“আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছলনা কর না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোন কোন লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দেইও, তবে অবশ্য কিছু লোককে আযাবও দেব। কারণ, তারা ছিল গোনাহগার” (আত তাওবাহ ৯:৬৫-৬৬)
৭- যাদুবিদ্যা – একজন ব্যক্তিকে আরেকজনের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়ার জন্য বা একজন ব্যক্তির সাথে অন্য ব্যক্তির ভালোবাসা সৃষ্টির জন্য যাদু করা এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। যে ব্যক্তি এগুলো করবে বা এগুলোর সমর্থন করবে সে কাফির। কেননা:
“তারা ঐ শাস্ত্রের অনুসরণ করল, যা সুলায়মানের রাজত্ব কালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। সুলায়মান কুফর করেনি; শয়তানরাই কুফর করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা এবং বাবেল শহরে হারুত ও মারুত দুই ফেরেশতার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তা শিক্ষা দিত। তারা উভয়ই একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরীক্ষার জন্য; কাজেই তুমি কাফের হয়ো না”। (বাকারাহ ২: ১০২)
৮- মুশরিকদের সমর্থন দেয়া এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সহযোগিতা করা। এর প্রমাণ হল এ আয়াতটি যেখানে আল্লাহ বলেন:
“হে মুমিণগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না” (মা’য়িদাহ ৫:৫১)
৯- যারা বিশ্বাস করে যে কিছু ব্যক্তিদের মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আইনের বাইরে কাজ করার অনুমতি আছে যেমন অনুমতি ছিল মুসা (আ) এর আইনের বাইরে খিযির (আ) এর কাজ করার, তারা কাফির। কেননা আল্লাহ বলেন:
“যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতি গ্রস্ত” । (ইমরান ৩: ৮৫)
১০- আল্লাহর মনোনীত ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়া বা মুখ ফিরিয়ে নেয়া, এটাকে না শেখা এবং এর অনুসারে জীবন যাপন না করা। এর প্রমান হল:
“যে ব্যক্তিকে তার পালনকর্তার আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দান করা হয়, অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে যালেম আর কে? আমি অপরাধীদেরকে শাস্তি দেব” (সেজদাহ ৩২:২২)
এ সকল কর্মকান্ড একজন ব্যক্তির জীবনে ইসলামকে অকার্যকর করে দেয় তা সে কৌতুক করেই থাকুক বা নিষ্ঠাবান হয়েই করুক বা হোক সে ধর্মভীরু। যদি তাকে বাধ্য না করা হয়ে থাকে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। উপরের প্রত্যেকটি অত্যন্ত সাঙ্ঘাতিক এবং এ ধরণের ঘটনা অনেক হয়ে থাকে। মুসলিমদের এ ব্যাপারে সচেতন থাকা এবং এই অপরাধগুলোর মধ্যে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে ভীত থাকা উচিৎ। আল্লাহর কাছে আমরা এ বিষয়গুলো থেকে নিরাপদে থাকার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করি এবং সাহায্য প্রার্থনা করি তার ক্রোধ ও কঠিন শাস্তি থেকে। মুহাম্মদ (সা) ও তার পরিবারের উপর এবং তার সহযোগীদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক।
উপরিউক্ত ৪ নং পয়েন্টে তারাও অন্তর্ভূক্ত যারা বিশ্বাস করে যে ইসলামী শরীয়াহ ব্যতীত অন্য কোন মানবরচিত বিধান বা মতবাদ বেশী কল্যাণকর অথবা সমকক্ষ; অথবা এটা বিশ্বাস করে যে, ইসলামী শরীয়াহর আশ্রয় নেয়া উত্তম জানা সত্ত্বেও অন্য কোন আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ আছে; অথবা মনে করে যে একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামীক সিস্টেম প্রয়োগ করা সম্ভব নয়; অথবা মনে করে যে মুসলিমদের পশ্চাৎপদতার জন্য ইসলাম দায়ী; অথবা মনে করে যে এটা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির ব্যাক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ তার জীবনের অন্য কোন পর্যায়ে এটা মানা প্রয়োজন নাই।
উপরিউক্ত ৪ নং পয়েন্টে আরও অন্তর্ভূক্ত হল যারা মনে করে, আল্লাহর হুকুম পালন করতে গিয়ে চোরের হাত কাটা বা বিবাহিত ব্যাভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা করা আধুনিক যুগে যথাযথ নয়।
এর মধ্যে আরও আছে, তারা যারা মনে করে যে শারীয়াহর আইন অন্য যে কোন আইন থেকে উত্তম অথচ বিশ্বাস করে যে এরপরও অন্য আইন অনুযায়ী শাসন করার সুযোগ আছে, কেননা এভাবে সে সেটাকে হালাম মনে করল যেটা আলেমদের ঐক্যমত অনুযায়ী আল্লাহ হারাম করেছেন। আল্লাহর কাছে আমরা এ বিষয়গুলো থেকে নিরাপদে থাকার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করি এবং সাহায্য প্রার্থনা করি তার ক্রোধ ও কঠিন শাস্তি থেকে। মুহাম্মদ (সা) ও তার পরিবারের উপর এবং তার সহযোগীদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক।
তথ্যসূত্র: http://www.islam-qa.com/en/ref/31807

বি.দ্র.: শাইখ ইবনে বা’য সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ও অনেকগুলো ইসলামী কাউন্সিল ও কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সন্মধ্যে এবং তার ফতোয়া সম্পর্কে আরও জানতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন অথবা গুগল করুন।

মসজিদে প্রবেশ করে সরাসরি বসে পড়া !


এই অভ্যাস সুন্নাতের সরাসরি বিরোধী এবং মসজিদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার শামিল। রাসূল (ছাঃ) এটাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
عَنْ أَبِىْ قَتَادَةَ السُّلَمِيِّ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ  قَالَ إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ أَنْ يَجْلِسَ.
আবু ক্বাতাদা সুলামী থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন সে যেন বসার পূর্বে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করে’।[1]
عَنْ أَبِىْ قَتَادَةَ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ  إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلاَ يَجْلِسْ حَتَّى يُصَلِّيَ رَكْعَتَيْنِ.
আবু ক্বাতাদা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে তখন সে যেন না বসে, যতক্ষণ দুই রাক‘আত ছালাত না পড়বে’।[2] মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করা কত গুরুত্বপূর্ণ নিম্নের হাদীছটি লক্ষণীয় :
عَنْ أَبِى قَتَادَةَ قَالَ دَخَلْتُ الْمَسْجِدَ وَرَسُوْلُ اللهِ  جَالِسٌ بَيْنَ ظَهْرَانَىِ النَّاسِ قَالَ فَجَلَسْتُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ  مَا مَنَعَكَ أَنْ تَرْكَعَ رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ أَنْ تَجْلِسَ قَالَ فَقُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ رَأَيْتُكَ جَالِسًا وَالنَّاسُ جُلُوْسٌ قَالَ فَإِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلاَ يَجْلِسْ حَتَّى يَرْكَعَ رَكْعَتَيْنِ.
আবু ক্বাতাদা (রাঃ) বলেন, আমি একদা মসজিদের প্রবেশ করলাম। তখন রাসূল (ছাঃ) লোকদের মাঝে বসেছিলেন। আমি গিয়ে বসে গেলাম। রাসূল (ছাঃ) আমাকে বললেন, বসার আগে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? আমি বললাম, আপনাকে এবং জনগণকে বসে থাকতে দেখলাম তাই। তখন তিনি বললেন, তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে তখন যেন দুই রাক‘আত ছালাত আদায় না করা পর্যন্ত না বসে।[3]
এমনকি জুম‘আর দিনে খুৎবা অবস্থায় যদি কেউ মসজিদে প্রবেশ করে তবুও তাকে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করে বসতে হবে।
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ قَالَ دَخَلَ رَجُلٌ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالنَّبِيُّ  يَخْطُبُ فَقَالَ أَصَلَّيْتَ قَالَ لَا قَالَ قُمْ فَصَلِّ رَكْعَتَيْنِ.
জাবের (রাঃ) বলেন, ‘নবী করীম (ছাঃ) জুম‘আর দিনে খুৎবা দিচ্ছিলেন এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, তুমি কি ছালাত আদায় করেছ? সে বলল, না। তখন তিনি বললেন, তুমি দাঁড়াও দুই রাক‘আত ছালাত আদায় কর’।[4]
[1]. ছহীহ বুখারী হা/৪৪৪, ১/৬৩ পৃঃ, (ইফাবা হা/৪৩১, ১/২৪৪ পৃঃ), ‘ছালাত’ অধ্যায়, ‘কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে তখন দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করবে’ অনুচ্ছেদ; ছহীহ মুসলিম হা/১৬৮৭; মিশকাত হা/৭০৪, পৃঃ ৬৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৬৫২, ২/২১৭ পৃঃ, ‘মসজিদ সমূহ’ অনুচ্ছেদ। [2]. ছহীহ বুখারী হা/১১৬৩, ১/১৫৬ পৃঃ, ‘তাহাজ্জুদ’ অধ্যায়, ‘রাত্রির ছালাত দুই দুই রাক‘আত’ অনুচ্ছেদ-২৫। [3]. ছহীহ মুসলিম হা/১৬৮৮, ১/২৪৮ পৃঃ, (ইফাবা হা/১৫২৫), ‘মুসাফিরের ছালাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১১। [4]. ছহীহ বুখারী হা/৯৩০ ও ৯৩১, ১/১২৭ পৃঃ, (ইফাবা হা/৮৮৩ ও ৮৮৪, ২/১৯০ ও ১৯১ পৃঃ), ‘জুম‘আর ছালাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩২; ছহীহ মুসলিম হা/২০৫৫ ও ২০৫৬, ১/২৮৭ পৃঃ, ‘জুম‘আ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৫।

সুএঃ
বইঃ জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছালাত,
মোযাফর বিন মহসিন

অযু ব্যতীত কুরআনুল কারিম স্পর্শ করার বিধান


প্রথম ফতোয়া:
অযু ব্যতীত কুরআনুল কারিম স্পর্শ করার বিধান
শায়খ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: অযু ব্যতীত মুসহাফ স্পর্শ করা অথবা একস্থান থেকে অপর স্থানে নেওয়ার বিধান কি? এবং অযু ব্যতীত কুরআন তিলাওয়াত করার বিধান কি?
তিনি উত্তরে বলেন: “জমহুর (অধিকাংশ) আহলে ইলমের নিকট অযু ব্যতীত মুসহাফ স্পর্শ করা জায়েয নয়। চার ইমামের ফতোয়া এটাই। নবী সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ এ ফতোয়া প্রদান করতেন। আমর ইবনে হাযম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত একটি সহি হাদিসে এসেছে, যা গ্রহণ করতে কোনো সমস্যা নেই। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামান বাসীদের নিকট লিখে পাঠান:
((أَنْ لَا يَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلَّا طَاهِرٌ)).
“পবিত্র সত্তা ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না”।সনদের বিচারে হাদিসটি জায়্যিদ। এ হাদিসের একাধিক সনদ রয়েছে, যার একটি অপরটি দ্বারা শক্তিশালী হয়।
অতএব ছোট-বড় উভয় প্রকার নাপাকী থেকে পবিত্রতা অর্জন ব্যতীত কোনো মুসলিমের পক্ষে মুসহাফ স্পর্শ করা বৈধ নয়। অনুরূপ এক জায়গা থেকে অপর জায়গায় স্থানান্তর করাও বৈধ নয় যদি স্থানান্তরকারী নাপাক হয়। তবে কোনো আড়ালের মাধ্যমে স্পর্শ বা স্থানান্তর করা বৈধ, যেমন গিলাফের উপর থেকে স্পর্শ করা, বা থলির ভেতর বহন করা ইত্যাদি। আড়াল ব্যতীত সরাসরি কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা জমহুর আহলে ইলমের নিকট বৈধ নয়। হ্যাঁ, মুখস্থ তিলাওয়াত করা বৈধ; অনুরূপ শিক্ষার্থীর হাতে রাখা মুসহাফ থেকে মুয়াল্লিমের তিলাওয়াত করা বৈধ; তবে বড় নাপাকির কারণে নাপাক বা জুনুবি ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়। নবী সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত, জানাবত তথা গোসল ফরয ব্যতীত কোনো অবস্থা নবী সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন তিলাওয়াত থেকে বিরত রাখত না। ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ একটি জায়্যেদ সনদে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাথরুম থেকে এসে কুরআনুল কারিমের কিছু অংশ তিলাওয়াত করেন এবং বলেন:
((هَذَا لِمَنْ لَيْسَ بِجُنُبٍ، فَأَمَّا الْجُنُبُ فَلَا، وَلَا آيَةَ))
“এ বিধান হচ্ছে তার জন্য যে জুনুবি নয়, কিন্তু যে জুনুবি তার জন্য তিলাওয়াত করা বৈধ নয়, এক আয়াতও নয়”।[1] জুনুবি ব্যক্তি মুসহাফ দেখে কিংবা মুখস্থ কোনো ভাবেই গোসল ব্যতীত কুরআন পড়বে না। আর ছোট নাপাকের কারণে নাপাক ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ পড়বে, কিন্তু স্পর্শ করবে না।
এ মাসআলার সাথে আরেকটি মাসআলা সম্পৃক্ত; আর তা হচ্ছে হায়েয (ঋতুমতী) ও নিফাসের নারীদের কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করার বিধান। তাদের কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করার বৈধতার ব্যাপারে আহলে ইলম দ্বিমত পোষণ করেছেন। কেউ বলেছেন তাদের জন্য তিলাওয়াত করা বৈধ নয়, কারণ তারা জুনুবি ব্যক্তির ন্যায়। দ্বিতীয় অভিমত হচ্ছে তাদের জন্য মুখস্থ তিলাওয়াত করা বৈধ, তবে স্পর্শ করবে না এবং তারা জুনুবি ব্যক্তির মত নয়। কারণ হায়েস ও নিফাসের সময় অনেক লম্বা হয়, জুনুবি ব্যক্তির মত স্বল্পকালীন নয়। দ্বিতীয়ত জুনুবি ব্যক্তি যখন ইচ্ছা গোসল করে কুরআন তিলাওয়াত করতে সক্ষম, কিন্তু হায়েয ও নিফাসের নারীদের পক্ষে এরূপ করা সম্ভব নয়। অতএব তাদেরকে জুনুবি ব্যক্তির সাথে তুলনা করা সঠিক নয়। তাদের জন্য মুখস্থ কুরআন পড়া বৈধ, এটাই অধিক বিশুদ্ধ। কারণ তাদের কুরআন তিলাওয়াতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়, এমন কোনো দলিল নেই, বরং তাদের কুরআন তিলাওয়াতকে বৈধতা প্রদানকারী অনেক দলিল রয়েছে। বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু‘আনহাকে বলেন, হজের মৌসুমে যখন তার হায়েয হয়েছিল:
((افْعَلِي مَا يَفْعَلُ الْحَاجُّ، غَيْرَ أَنْ لَا تَطُوفِي بِالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِي))
“হাজিরা যা করে তুমিও তাই কর, তবে পবিত্র হওয়ার আগ পর্যন্ত বায়তুল্লাহ তাওয়াফ কর না”।[2] হাজী সাহেবগণ কুরআন তিলাওয়াত করেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কুরআন তিলাওয়াত থেকে নিষেধ করেননি, এ থেকে প্রমাণিত হয় ঋতুমতী নারীর জন্য কুরআনুল কারিম তিলাওয়াত করা বৈধ। অনুরূপ নির্দেশ প্রদান করেছেন আসমা বিনতে উমাইসকে, যখন সে বিদায় হজের মিকাতে মুহাম্মদ বিন আবু বকরকে প্রসব করেছিল। এ থেকে প্রমাণিত হয় হায়েয ও নেফাসের নারীর জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা বৈধ, তবে স্পর্শ করা ব্যতীত। পক্ষান্তরে ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদিস, যেখানে নবী সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
((لَا تَقْرَأْ الْحَائِضُ وَلَا الْجُنُبُ شَيْئًا مِنَ الْقُرْآنِ))
“হায়েয ও জুনুবি ব্যক্তি কুরআনের কোনো অংশ তিলাওয়াত করবে না”।[3] হাদিসটি দুর্বল। এ সনদে ইসমাইল ইবনে আইয়াশ রয়েছে, আহলে ইলমগণ হিজাজিদের থেকে তার বর্ণিত হাদিসকে দুর্বল বলেছেন। তারা বলেন, সে যখন শাম তথা তার দেশের লোকদের থেকে বর্ণনা করেন ঠিক আছে, কিন্তু যখন হিজাজিদের থেকে বর্ণনা করেন তখন দুর্বল। এ হাদিস তাদের থেকেই বর্ণিত, অতএব হাদিসটি দুর্বল”।[4]
দ্বিতীয় ফতোয়া
প্রফেসর ড. আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-খলিল কুরআনুল কারিম স্পর্শ করার সময় অযুর বিধান সংক্রান্ত এক নিবন্ধে বলেন:
الحمد الله والصلاة والسلام على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين
অতঃপর: যেসব ফিকহি মাসআলা সম্পর্কে অধিক প্রশ্ন করা হয় এবং যার প্রয়োজন খুব বেশী দেখা দেয়, তার মধ্যে ‘অযু ব্যতীত কুরআনুল কারিম স্পর্শ করার মাসআলাটি অন্যতম’।
মাসআলাটি বিরোধপূর্ণ: সকল আলেম একমত যে, কুরআনুল কারিম স্পর্শ করার জন্য অযু করা বৈধ ও মুস্তাহাব, তবে অযু করা ওয়াজিব কিনা এ নিয়ে তাদের দ্বিমত রয়েছে। কেউ বলেন অযু করা ওয়াজিব, কেউ বলেন মুস্তাহাব। নিম্ন আমরা দলিলসহ তাদের অভিমত উল্লেখ করছি:
প্রথম অভিমত:
পবিত্র সত্তা ব্যতীত কারো জন্য কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা বৈধ নয়, তাই অপবিত্র ব্যক্তি কুরআন স্পর্শ করবে না। এটাই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জমহুর আলেমদের অভিমত। এটাই হানাফি[5], মালেকি[6], শাফেয়ি[7] ও হাম্বলিদের[8] মাযহাব। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ এ অভিমত গ্রহণ করেছেন।[9] তাদের দলিল, ইমাম মালিক বর্ণনা করেন:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِى بَكْرِ بن مُحَمد بن عَمْرو بْنِ حَزْمٍ، أَنَّ فِي الْكِتَابِ الَّذِي كَتَبَهُ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لِعَمْرِو بْنِ حَزْمٍ: ((أَنْ لاَ يَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلاَّ طَاهِرٌ ))
আব্দুল্লাহ ইবনে আবি বকর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে হাযম সূত্রে ইমাম মালিক রহ. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমর ইবনে হাযমকে যে পত্র লিখেছিলেন, তাতে লিখা ছিল: ‘পবিত্র ব্যক্তি ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না”।[10]
এ হাদিস মুত্তাসিল ও মুরসাল উভয় সনদে বর্ণিত হয়েছে, ইমাম মালিক মুরসাল এবং ইমাম নাসায়ি ও ইবনে হিব্বান রহ. মুত্তাসিল বর্ণনা করেছেন; তবে যারা মুরসাল বলেছেন তাদের কথাই অধিক বিশুদ্ধ, সনদ মুত্তাসিল মানলে হাদিসটি সহি নয়।
ইমাম আহমদকে এ হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেন: আশা করছি হাদিসটি সহি।আসরাম বলেন: ইমাম আহমদ হাদিসটিকে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন।[11]
এ হাদিস সম্পর্কে ইমাম আহমদ থেকে দু’টি বর্ণনা রয়েছে, এক বর্ণনায় তিনি সহি বলেছেন, অপর বর্ণনায় তিনি হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করেছেন। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, হাদিসটি সহি বলা যায় এবং দলিল হওয়ার যোগ্য, যদিও সনদ সংরক্ষিত নয়।
হাদিসটি মুরসাল হওয়া সত্ত্বেও ইমাম আহমদ ও অন্যান্য ইমামগণ গ্রহণ করেছেন, কারণ গোটা উম্মত এটাকে মেনে নিয়েছে ও তার দাবির উপর আমল করে আসছে।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন: “ইমাম আহমদ বলেছেন: এতে সন্দেহ নেই যে, নবী সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমর ইবনে হাযমকে এ হাদিস লিখেছেন।[12] হাফেয ইবনে হাজার রহ. ইবনে তাইমিয়ার কথা সংক্ষেপ করে বলেন: ইমামদের একটি দল উল্লেখিত চিঠি সংবলিত হাদিসকে সহি বলেছেন, সনদের বিবেচনায় নয়, বরং প্রসিদ্ধির বিবেচনায়। ইমাম শাফিয়ি স্বীয় রিসালায় বলেন: আমর ইবনে হাযমকে লিখা চিঠি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত বলেই আহলে ইলম তা গ্রহণ করেছেন”।[13] এ থেকে প্রমাণ হয় হাদিসটি গ্রহণযোগ্য দলিল।
দ্বিতীয় দলিল:
আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
﴿ إِنَّهُۥ لَقُرۡءَانٞ كَرِيمٞ ٧٧ فِي كِتَٰبٖ مَّكۡنُونٖ ٧٨ لَّا يَمَسُّهُۥٓ إِلَّا ٱلۡمُطَهَّرُونَ ٧٩ ﴾ [الواقعة: ٧٧، ٧٩]
“নিশ্চয় এটি মহিমান্বিত কুরআন, যা সুরক্ষিত কিতাবে রয়েছে, কেউ তা স্পর্শ করবে না পবিত্রগণ ছাড়া”।[14]
“দলিল হিসেবে এ আয়াতটি পেশ করা দুরস্ত নয়, কারণ পূর্বাপর বিষয় থেকে স্পষ্ট যে, পবিত্রগণ ব্যতীত যে কিতাব কেউ স্পর্শ করে না, সেটা মাকনুন কিতাবে বিদ্যমান। আর কিতাবে মাকনুন দ্বারা উদ্দেশ্য লাওহে মাহফুয”।[15] আর لَا يَمَسُّهُ এর সর্বনাম লাওহে মাহফুযের দিকে ফিরেছে, কারণ এটাই তার নিকটতম বিশেষ্য। অতএব অযুসহ কুরআন স্পর্শ করার পক্ষে এ আয়াত দলিল নয়।
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন: “আমি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাকে শুনেছি, তিনি এ আয়াতকে ভিন্নভাবে দলিল হিসেবে পেশ করতেন। তিনি বলেন, সতর্কতার একটি দিক হচ্ছে, আসমানে বিদ্যমান সহিফাগুলো যখন পবিত্র সত্বা ব্যতীত কেউ স্পর্শ করে না, অনুরূপ আমাদের হাতে বিদ্যমান সহিফাগুলো আমরা পবিত্র অবস্থা ব্যতীত স্পর্শ করব না। হাদিসটি মূলত এ আয়াত থেকে নিঃসৃত”।[16]
সত্যকথা হচ্ছে, সতর্কতা বা যেভাবেই হোক এ আয়াতে তার পক্ষে কোনো দলিল নেই। অযু ব্যতীত কুরআন স্পর্শ করা যাবে না মর্মে যদি অন্যান্য স্পষ্ট দলিল না থাকত, এ আয়াতকে তার পক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করা যেত না।
তৃতীয় দলিল:
ইসহাক ইবনে রাহওয়েহ বর্ণনা করেন, “অযুসহ কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের আমল ছিল”।[17]
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:সালমান ফারসি, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর ও অন্যান্য সাহাবিদের এ অভিমত ছিল। সাহাবীদের কেউ তাদের বিরোধিতা করেছেন আমরা জানি না”।[18]
দ্বিতীয় অভিমত:
কুরআনুল কারিম স্পর্শ করার জন্য অযু করা মুস্তাহাব, তবে অযু ব্যতীতও কুরআন স্পর্শ করা জায়েয। এটা যাহেরিয়াদের মাযহাব, ইবনে হাযম এ অভিমতকে শক্তিশালী করেছেন।[19] এ মতের পক্ষে তারা নিম্নের দলিলগুলো পেশ করেন:
প্রথম দলিল:
কুরআনুল কারিম ও সহি সুন্নায় এমন কোনো দলিল নেই, যার দ্বারা প্রমাণ হয় যে, অযু ব্যতীত মুসহাফ (কুরআন) স্পর্শ করা যাবে না। তিলাওয়াতের জন্য মুসহাফ স্পর্শ করা ভালো কাজ, যার জন্য ব্যক্তি অবশ্যই সাওয়াব পাবে। যদি কেউ মুসহাফ স্পর্শ করা থেকে বিরত রাখতে চায়, তাকে অবশ্যই দলিল পেশ করতে হবে।[20]
দ্বিতীয় দলিল:
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব তাকে বলেছেন: ‘কুরাইশের দলনেতা হিসেবে হিরাকল তার নিকট দূত পাঠান … …’ এ ঘটনায় রয়েছে: অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি তলব করেন, যা দিয়ে দিহইয়া কালবিকে বসরার প্রধানের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল। হিরাকল চিঠি হাতে নিয়ে পড়ল, তাতে ছিল: “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহর পক্ষ থেকে রোমের প্রধান হিরাকলের নিকট। হিদায়াত অনুসরণকারীর উপর সালাম, অতঃপর: আমি তোমাকে ইসলামের আহ্বান জানাচ্ছি, ইসলাম গ্রহণ কর নিরাপদ থাকবে। আল্লাহ তোমাকে দ্বিগুণ সাওয়াব প্রদান করবেন। আর যদি তুমি বিরত থাক, তাহলে তোমার উপর আরিসিনদের পাপ।
﴿يَٰٓأَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ تَعَالَوۡاْ إِلَىٰ كَلِمَةٖ سَوَآءِۢ بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمۡ أَلَّا نَعۡبُدَ إِلَّا ٱللَّهَ وَلَا نُشۡرِكَ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗا وَلَا يَتَّخِذَ بَعۡضُنَا بَعۡضًا أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِۚ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَقُولُواْ ٱشۡهَدُواْ بِأَنَّا مُسۡلِمُونَ ٦٤ ﴾ [ال عمران: ٦٤]
‘হে কিতাবীগণ, তোমরা এমন কথার দিকে আস, যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করব না। আর তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করব না এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ ছাড়া রব হিসাবে গ্রহণ করব না। তারপর যদি তারা বিমুখ হয় তবে বল, ‘তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম”।[21]
ইবনে হাযম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনুল কারিমের এ আয়াতসহ নাসারাদের নিকট চিঠি প্রেরণ করেছেন। তিনি অবশ্যই জানতেন যে, এ চিঠি তারা স্পর্শ করবে, তবুও তিনি আয়াত লিখেছেন।[22]
এ দলিলের উত্তর: চিঠিতে বিদ্যমান আয়াতটি কুরআনুল কারিমের হুকুম রাখে না, বরং এটা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহ ওয়াসাল্লামের বক্তৃতার অংশ, অথবা তাফসীরের কিতাবে বিদ্যমান আয়াতের ন্যায় একটি আয়াত, যা অযু ব্যতীত স্পর্শ করা বৈধ।[23]
তৃতীয় দলিল:
মুসলিমরা সর্বদা তাদের বাচ্চাদের অযু ব্যতীত কুরআন স্পর্শ করার অনুমতি দিয়ে আসছেন, যদি এমন হত যে, অযু ব্যতীত কুরআন স্পর্শ করা যাবে না, তাহলে বাচ্চাদের তারা এ অনুমতি দিতেন না।
এ দলিলের উত্তর: এটা প্রয়োজনের খাতিরে ও বিশেষ স্বার্থের জন্য বৈধ, যদি বাচ্চাদের অযু ব্যতীত কুরআন পড়তে নিষেধ করা হয়, তাহলে তাদের কুরআন তিলাওয়াত অবশ্যই কমে যাবে। অতএব মুসলিমদের এ আমল দলিল হিসেবে পেশ করা যথাযথ নয়।
বিশুদ্ধ অভিমত:
ইনশাআল্লাহ, যারা বলেন কুরআন স্পর্শ করার জন্য অবশ্যই অযু করা শর্ত তাদের কথাই বিশুদ্ধ। বিশেষ করে এটা পূর্বাপর সকল মনীষীদের মাযহাব। ইবনে হাযমের দলিল খুব দুর্বল, যার উত্তর আমরা পূর্বে পেশ করেছি।
তৃতীয় ফতোয়া:
শায়খ উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ একসময় বলতেন অযু ব্যতীত কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা বৈধ, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি এ ফতোয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করেন।
অতঃপর তিনি বলেন: “অযু ব্যতীত কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা বৈধ নয়, কারণ একটি হাদিসে আছে নবী সা. বলেছেন:
((أَنْ لَا يَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلَّا طَاهِرٌ)).
“পবিত্র ব্যক্তি ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না”।[24] এ হাদিস যদিও মুরসাল, কিন্তু উম্মত তাকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করার কারণে সহি পরিণত হয়েছে। আর হাদিসে বিদ্যমান طاهرٌ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য পবিত্র ব্যক্তি, যার অযু রয়েছে। হাদিসের অর্থ এ নয় যে, মুমিন ব্যতীত কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো মুমিন ব্যক্তিকেطاهرٌ সম্বোধন করেননি। অতএব তাহির দ্বারা উদ্দেশ্য অযু সম্পন্ন ব্যক্তি; তার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে অযুর আয়াত, যেখানে আল্লাহ তা‘আলা অযু, গোসল ও তায়াম্মুমের কথা উল্লেখ করেছেন, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ مَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيَجۡعَلَ عَلَيۡكُم مِّنۡ حَرَجٖ وَلَٰكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمۡ ٦ ﴾ [المائ‍دة: ٦]
“আল্লাহ তোমাদের উপর কঠিন করতে চান না, তবে তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান”।[25]
অতএব কোনো ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় অযু ব্যতীত কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা, তবে রোমাল, অথবা হাত মোজা অথবা মিসওয়াক দ্বারা যদি কুরআনুল কারিমের পৃষ্ঠা উল্টায় তার অনুমিত রয়েছে”। এটাই শায়খের সর্বশেষ ফতোয়া:
قال في ” الشرح الممتع ” : فالذي تَقَرَّرَ عندي أخيراً: أنَّه لا يجوز مَسُّ المصْحَفِ إلا بِوُضُوء.
শায়খ, ‘আশ-শারহুল মুমতি’ গ্রন্থে বলেন: “সর্বশেষ আমার নিকট প্রমাণিত হয়েছে যে, অযু ব্যতীত কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা বৈধ নয়”।
সমাপ্ত

[1] আহমদ: (৮৭৪)
[2] মুসলিম: (৮/১৪৭)
[3] তিরমিযি: (১৩১)
[4] দেখুন: মাজমু ফতোয়া ও মাকালাত মুতানাউওয়্যিআহ, ৪র্থ খণ্ড।
[5] মারাকিল ফালাহ: (পৃ.৬০), বাদায়েউস সানায়ে ফি তারতীবিশ শারায়ে: (১/৩৩)
[6] আশ-শারহুস সাগির: (১/১৪৯), মাওয়াহিবুল জালিল ফি শারহি মুখতাসারিল খালিল: (১/৩০৩)
[7] মুগনিল মুহতাজ: (১/৩৬), আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব: (২/৬৫)
[8] আল-ইনসাফ ফি মারিফাতির রাজিহ মিনাল খিলাফ, লিল মুরদাওয়াঈ: (১/২২৩), শাহরু মুনতাহাল ইরাদাত: (১/৭৭)
[9] মাজমুউল ফতোয়া: (২১/২৬৬)
[10] আল-মুয়াত্তা: (৫৩৪), আবুদাউদ ফিল মারাসিল: (৯৩)
[11] আত-তিবইয়ান ফি আকসামিল কুরআন: (পৃ.২২৯), আত-তালখিসুল হাবির: (৪/৫৮)
[12] মাজমুউল ফতোয়া: (২১/২৬৬)
[13] আত-তালখিসুল হাবির: (৪/৫৮)
[14] সূরা ওয়াকিয়াহ: (৭৭-৭৯)
[15] আত-তিবইয়ান ফি আকসামিল কুরআন: (পৃ.২২৯)
[16] আত-তিবইয়ান ফি আকসামিল কুরআন: (পৃ.২২৯)
[17] মাসায়েলুল ইমাম আহমদ ও ইসহাক ইবনে রাহওয়েহ: (২/৩৪৫)
[18] মাজমুইল ফতোয়া: (২১/২৬৬)
[19] আল-মুহাল্লাহ: (১/৯৫)
[20] আল-মুহাল্লা বিল আসার: (১/৯৫)
[21] সূরা আলে-ইমরান: (৬৪)
[22] আল-মুহাল্লা বিল আসার: (১/৯৮)
[23] আল-মুগনি লি ইবনে কুদামাহ: (১/১০৯), নাইলুল আওতার: (১/২৬১)
[24] আল-মুয়াত্তা: (৫৩৪), আবুদাউদ ফিল মারাসিল: (৯৩)
[25] সূরা মায়েদাহ: (৬)
_________________________________________________________________________________
মুফতী: একদল বিজ্ঞ আলেম
অনুবাদক: সানাউল্লাহ নজিবশীর আহমদ
সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
সূত্র: ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব